পবিত্র মাহে রমজান মুসলমানদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আগমন করে। এই বরকতময় মাসের শেষ দশকে এমন একটি রাত রয়েছে, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য অসীম কল্যাণ ও রহমত লাভের উৎস। সেই মহিমান্বিত রাতের নাম লাইলাতুল কদর। এই রাতে ইবাদত-বন্দেগি করা হাজার মাস ইবাদত করার চেয়েও অধিক সওয়াবের। আল্লাহ তাআলা এই রাতকে এতটাই মর্যাদা দিয়েছেন যে পবিত্র কোরআনের একটি পূর্ণ সুরার নামই রাখা হয়েছে ‘কদর’, যা কিয়ামত পর্যন্ত পঠিত হতে থাকবে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহ দিতেন। আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।’ (সহিহ বুখারি: ২০২০)। অন্য হাদিসে শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। এ কারণেই শেষ দশকের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাতগুলোতে বেশি ইবাদতের প্রতি আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত। অনেক আলেমের মতে, ২৭তম রাতেই অধিকাংশ সময় লাইলাতুল কদর হয়ে থাকে, যদিও এর নির্দিষ্ট রাত গোপন রাখা হয়েছে, যেন মুসলমানেরা পুরো শেষ দশকজুড়েই ইবাদতে মগ্ন থাকে।
লাইলাতুল কদরের বিশেষ তাৎপর্য হলো, এ রাতে ফেরেশতারা রহমত, বরকত ও কল্যাণ নিয়ে পৃথিবীর বুকে আগমন করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এ রাতে আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতা ও জিবরাইল (আ.) সমস্ত কল্যাণকর জিনিস নিয়ে দুনিয়ায় অবতীর্ণ হন এবং সূর্যোদয়ের আগপর্যন্ত সারা রাত শান্তি ও রহমত বিদ্যমান থাকে।’ (সুরা কদর: ৪-৫)। এ ছাড়া এ রাতে কেউ আন্তরিকভাবে ইবাদত করলে আল্লাহ তাআলা তার আগের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় মাহে রমজানের রোজা রাখবে, তার আগের সব (ছগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদত করবে, তার আগের সব (ছগিরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ২০১৪)। এ রাতে তাই নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, দোয়া, তাওবা-ইস্তিগফার ও নফল ইবাদতে বেশি সময় ব্যয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লাইলাতুল কদরে পড়ার জন্য একটি বিশেষ দোয়া নবীজি (সা.) উম্মতকে শিখিয়েছেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, যদি আমি লাইলাতুল কদর পেয়ে যাই, তাহলে কী দোয়া পড়ব?’ উত্তরে নবীজি (সা.) এই দোয়াটি পড়তে বলেছেন—‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।’ দোয়াটির অর্থ হলো—‘হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ (জামে তিরমিজি: ৩৫১৩)
কোরআন নাজিলের পবিত্র স্মৃতিবাহী লাইলাতুল কদর মানবজাতির জন্য আল্লাহ তাআলার অপরিসীম দয়া ও করুণার অনন্য উপহার। হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এ রাত আত্মশুদ্ধি, গুনাহ মাফ এবং আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে। এ রজনীতে যে মুমিন একনিষ্ঠ চিত্তে ইবাদতে নিমগ্ন থাকে, সে যেন ইবাদতের ক্ষেত্রে বছরের সবচেয়ে মূল্যবান সুযোগটি কাজে লাগায়। আমাদেরও উচিত এই রাতকে অবহেলা না করে আন্তরিকতার সঙ্গে ইবাদতে মশগুল থাকা।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।