হোম > ইসলাম

সুমামা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের অবিশ্বাস্য ঘটনা

ইসলাম ডেস্ক 

পবিত্র কাবা। ছবি: সংগৃহীত

সাহাবিদের পদধ্বনিতে মুখর মদিনার পথ। একদল অশ্বারোহী যোদ্ধা ফিরে এলেন নাজদের দিক থেকে। তাঁদের সঙ্গে একজন বন্দী—যার চোখেমুখের দৃঢ়তা দেখে বোঝা যায়, তিনি সাধারণ কেউ নন। বন্দীর নাম সুমামা বিন উসাল। ইয়ামামার প্রভাবশালী গোত্রের সরদার। তাঁকে নিয়ে আসা হয় মসজিদে নববীতে। বাঁধা হয় একটি খুঁটির সঙ্গে।

সুমামার চোখ ক্রোধের অনল। মুখে রাগের ছাপ। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, তাঁর সঙ্গে কী হবে। । ভাবছেন, এই নতুন ধর্মের নবী তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করবেন? তাঁর মনে প্রতিশোধের আগুন। হৃদয়ে ঘৃণা আর বিদ্বেষ।

সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। হাত বাঁধা অবস্থায় সুমামা বসে আছেন। তাঁর মন হাজারো ভাবনায় অস্থির। এমন সময় এক শান্ত, সৌম্য অবয়ব তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনিই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। এই মহামানবের মুখে কোনো ভর্ৎসনা বা তিরস্কার নেই। চোখে ভাসছে শুধুই দয়া আর অনুকম্পা।

‘সুমামা, তুমি কী ভাবছ? তোমার কী ধারণা—আমি তোমার সঙ্গে কেমন আচরণ করব?’ নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন।

সুমামা কিছুটা অবাক হলেন। তিনি এমন কোমল প্রশ্ন আশা করেননি। তবুও তাঁর মুখের ভাব কঠোর রেখে বললেন, ‘হে মুহাম্মদ, ভাবছি তো অনেক কিছুই। তবে আমি আপনার কাছে উত্তম আচরণেরই আশা করছি। যদি আপনি আমাকে হত্যা করেন, তবে আপনি একজন খুনিকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি দয়া করেন, তবে আপনি একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপর অনুগ্রহ করবেন। আর যদি আপনি ধন-সম্পদ চান, তাহলে যা ইচ্ছা চাইতে পারেন, সব দেওয়া হবে।’

নবীজি (সা.) তাঁর কথা শুনে কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু মুচকি হেসে চলে গেলেন। তাঁর হাসি যেন সুমামার হৃদয়ে আলো ছড়িয়ে গেল। সারা রাত সুমামা চোখের পাতা একসঙ্গে করতে পারলেন না। ভাবনারা তার চোখে এসে ভর করল। জেগে রইলেন ভোর পর্যন্ত। তাঁর মনের দ্বন্দ্ব আরও বেড়ে গেল—‘এই মানুষটি এমন কেন? কেন তিনি কোনো প্রতিশোধ নিলেন না?’

পরের দিন আবারও নবীজি (সা.) এলেন। একই প্রশ্ন, ‘তোমার কী ধারণা—আমি তোমার সঙ্গে কেমন আচরণ করব?’

সুমামা আবারও একই জবাব দিলেন—‘আমি যা পূর্বেই বলেছি, তাই। আমি উত্তম আচরণ প্রত্যাশা করছি। যদি আপনি দয়া করেন, তবে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির ওপর দয়া করবেন। আর যদি হত্যা করেন, তবে একজন খুনিকে হত্যা করবেন।’

নবীজি (সা.) আজও চলে গেলেন, কোনো উত্তর দিলেন না। সুমামার মনের ভেতরে এক ঝড় বইতে শুরু করল। তাঁর মনের কঠিন দেয়াল যেন একটু একটু করে ভেঙে পড়ছিল। প্রতিশোধের আগুন নিভে গিয়ে সেখানে এক নতুন অনুভূতি তৈরি হচ্ছিল।

তৃতীয় দিন। সেই একই দৃশ্য, একই প্রশ্ন। এবার সুমামার কণ্ঠে কিছুটা নরম ভাব, চোখে কিছুটা অনুতাপ।

নবীজি (সা.) এবার বললেন, ‘তোমরা সুমামাকে ছেড়ে দাও।’

হুকুম শোনা মাত্রই তাঁর বাঁধন খুলে দেওয়া হলো।

সুমামা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না—তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত! কোনো বিনিময় ছাড়াই তিনি স্বাধীন! তিনি ধীরে ধীরে হেঁটে গেলেন মসজিদের পাশের একটি খেজুর বাগানে। সেখানে গিয়ে গোসল করলেন। গোসলের পানিতে তাঁর শরীর থেকে মনের সব বিদ্বেষ ও ঘৃণা ধুয়ে চলে গেল। মন শান্ত হলো। তিনি আশ্রয় নিলেন চির শান্তির ধর্ম ইসলামের ছায়াতলে। মসজিদে প্রবেশ করে পাঠ করলেন কালিমা শাহাদাত—‘আশহাদু আললা ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।’

নবীজি (সা.)-এর দিকে ফিরে বললেন, ‘হে মুহাম্মদ, আল্লাহর কসম, পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারা অপেক্ষা আর কারও চেহারা আমার কাছে অধিক ঘৃণ্য ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয় হয়ে গেছে। শপথ আল্লাহর! আপনার ধর্ম অপেক্ষা অধিক অপ্রিয় ধর্ম আমার কাছে আর কোনটিই ছিল না। কিন্তু এখন আপনার ধর্মই আমার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় হয়ে গেছে। রবের কসম! আপনার শহরের চেয়ে অধিক ঘৃণ্য শহর আর কোনটিই আমার কাছে ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে গেছে।’

সুমামার কণ্ঠে ছিল কৃতজ্ঞতার সুর। চোখে আনন্দের অশ্রু। জানালেন যে, তিনি বায়তুল্লাহর সফরে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মুসলিম অশ্বারোহী সৈন্যরা তাকে বন্দী করে নিয়ে আসে। তার মন বায়তুল্লাহয় যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। জানতে চাইলেন—এখন তিনি কী করবেন?

নবীজি (সা.) তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমার সুসংবাদ দিলেন এবং ওমরাহ পালনের আদেশ করলেন। পাশাপাশি ওমরাহর ইসলামি বিধি-বিধানগুলো সম্পর্কেও অবগত করে দিলেন।

সুমামা ওমরাহ করতে যখন মক্কায় পৌঁছলেন, এবং ইসলামের সৌন্দর্যের কথা মানুষের মাঝে প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন, তখন কুরাইশরা বলতে লাগল—‘তুমি তো কাফের হয়ে গেছ?’

সুমামা দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘তা হবে কেন! বরং আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি ইমান এনেছি। আল্লাহর কসম! এখন থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে ইয়ামামা থেকে একটি গমের দানাও আসবে না।’

ওমরাহ শেষে সুমামা (রা.) নিজ শহরে ফিরে গেলেন। সবাইকে জানালেন তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা। গোত্রের বাকিদের সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিলেন মক্কায় শস্য রপ্তানি।

তখন মক্কার খাদ্যশস্যের একমাত্র অবলম্বন ছিল ইয়ামামা। সুমামার কঠিন সিদ্ধান্তের ফলে কুরাইশরা দুর্ভিক্ষে পড়ে গেল। তারা আর কোনো উপায় না দেখে মহানবী (সা.)-এর কাছে আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে চিঠি লিখল—‘মুহাম্মদ, আপনি তো আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করার শিক্ষা দেন। মক্কায় থাকা আপনাদের আত্মীয়দের দিকেও তো আপনার দৃষ্টি রাখা দরকার। আপনার সাহাবি সুমামা মক্কায় খাদ্যশস্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। তার এই অবরোধের ফলে নারী-শিশুদের নিয়ে আমরা না খেয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার অবস্থা। আপনার আত্মীয়-স্বজন না খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ুক—তা কি আপনি চান! দয়া করে সুমামাকে বলে দিন সে যেন এই অবরোধ তুলে নেয়। আপনি সদয় হবেন বলে আমরা আশা রাখি।’

মক্কাবাসীর এই চিঠি পেয়ে দয়ার নবী সুমামাকে বলে দিলেন বায়তুল্লাহর সম্মানে এই অবরোধ যেন তুলে নেন।

নবী করিম (সা.)-এর আদেশ পেয়ে সুমামা আবারও অবাক হলেন—যে মক্কাবাসী তাঁকে মাতৃভূমি ছেড়ে আসতে বাধ্য করে, তাদের জন্যও তার কত দয়া! এরপর তিনি অবরোধ উঠিয়ে নিলেন।

তথ্যসূত্র: সহিহ্ বুখারি: ৪৬২, সহিহ্ মুসলিম: ১৭৬৪

রমজানের শেষ ১০ দিনের ইতিকাফে যে ফজিলত

সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি: বিংশ শতাব্দীর অমর জ্ঞানসাধক

নারীদের ইতিকাফের নিয়ম ও বিধান

আজকের নামাজের সময়সূচি: ১০ মার্চ ২০২৬

রমজান মাস পেয়েও যারা হতভাগা

ইমাম তাহাবি: আকিদা ও ফিকহ শাস্ত্রের অনন্য মহিরুহ

মেহমানদারি করায় আসমান থেকে এল সুখবর

ইতিকাফের যে মাসআলাগুলো জানা জরুরি

আজকের নামাজের সময়সূচি: ০৯ মার্চ ২০২৬

রমজানে জীবন বদলানোর ১০ উপায়