নবী-রাসুল ও সাহাবিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যুগে যুগে মুসলিম মনীষীরাও শ্রম ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মাধ্যমে তাঁরা আত্মনির্ভরশীল জীবন গড়তেন এবং দ্বীনদারির সঙ্গে দুনিয়াবি দায়িত্বের সমন্বয় ঘটাতেন। তাঁদের সততা, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতা অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
সাইদ ইবনে মুসাইয়িব (রহ.) ছিলেন মদিনার সাতজন প্রখ্যাত ফকিহর অন্যতম এবং তাবেয়ি যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম। তিনি খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনামলে ১৫ হিজরিতে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। হাদিস, ফিকহ ও তাফসিরে অসামান্য পাণ্ডিত্যের কারণে তাঁকে ‘আলিমুল উলামা’ বা আলেমদের শিক্ষক বলা হতো। তিনি তেল প্রক্রিয়াজাত করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
ইসলামি ফিকহের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন একজন কাপড় ব্যবসায়ী। কুফা শহরে তিনি সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। ব্যবসায় সততা ও আমানতদারির কারণে মানুষ তাঁর ওপর নির্দ্বিধায় আস্থা রাখত। তিনি সশরীরে শ্রম দিয়ে নিজে ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
ইমাম সুফিয়ান সাওরি (রহ.) ছিলেন অষ্টম শতাব্দীর একজন প্রভাবশালী ইসলামি পণ্ডিত, মুহাদ্দিস ও ফকিহ। পেশাগত জীবনে তিনি তেলের ব্যবসা করতেন। তাঁর এক ছাত্র ব্যবসা করতে অনীহা প্রকাশ করলে তিনি তাকে ধমক দিয়ে বলেন—‘চুপ করো। যদি আলেমদের হাতে নিজস্ব হালাল সম্পদ না থাকত, তবে ধনীরা তাদেরকে নিজেদের স্বার্থে সহজেই ব্যবহার করত।’
আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) ছিলেন ইলমে হাদিস, ফিকহ ও তাসাওউফের উচ্চমার্গের আলেম। হাদিসের জগতে পাণ্ডিত্য অর্জনের কারণে তাঁকে ‘আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস’ বলা হতো। তবে একদিকে যেমন তিনি জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস ছিলেন, অন্যদিকে ছিলেন একজন সফল ও সৎ ব্যবসায়ী। তাঁর উপার্জনের বড় অংশ তিনি ইলমের খিদমত, আলেমদের সহায়তা এবং জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন।
ভারত উপমহাদেশের ষষ্ঠ ও প্রভাবশালী মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তাঁর তত্ত্বাবধানেই হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘ফতোয়ায়ে আলমগীরী’ রচিত হয়। তিনি নিজ হাতে কোরআন লিখে, টুপি সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দারুল উলুম দেওবন্দের লাইব্রেরিতে এখনো তাঁর হাতের লেখা কোরআন পাওয়া যায়।
দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা শায়খুল ইসলাম মাওলানা কাসেম নানুতুবি (রহ.) মিরাঠের একটি ছাপাখানায় প্রুফ দেখার কাজ করতেন। নিজের পরিশ্রমেই তিনি পরিবারের খরচাদির ব্যবস্থা করতেন। দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে কোনো দিন বেতন-ভাতা গ্রহণ করেননি।
দেওবন্দ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা রশিদ আহমাদ গাঙ্গুহি (রহ.) হানাফি ফকিহ ও হাদিস বিশারদ ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান মুফতির দায়িত্ব পালন করেন। পেশাগত জীবনে তিনি বই বাঁধাইয়ের কাজ করতেন।
নিকট অতীতের জগদ্বিখ্যাত আলেম মুফতি সাইদ আহমদ পালনপুরি (রহ.) প্রথম জীবনে অল্প বেতনে দারুল দেওবন্দে শিক্ষকতা করতেন।
এতে তাঁর সংসারে অভাব লেগেই থাকত। এ জন্য স্বামী-স্ত্রী দুজনে ঠোঙা বানিয়ে বিক্রি করতেন।
পরে দেওবন্দ বাজারে একটি বইয়ের দোকান নেন। এতে দূর-দূরান্ত থেকে কিতাবের যে অর্ডারগুলো আসত, ওই কিতাবগুলো তিনি মাথায় করে পোস্ট অফিসে পৌঁছে দিতেন। পরবর্তী জীবনে তিনি লেখালেখির পেশা গ্রহণ করেছিলেন। সময়ের ব্যবধানে আল্লাহ তাআলা তাঁর শ্রমে অনেক বরকত দিয়েছিলেন। তাঁর শ্রম, মেধা ও সততার ফলে একসময় তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।
এভাবে ইতিহাসের পাতা ওলটালে দেখা যায় অসংখ্য মুসলিম মনীষী শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন।