মদিনার উত্তপ্ত মরুভূমি। মক্কার কুরাইশদের অন্যায় আর অত্যাচারের জবাব দিতে বদর প্রান্তরে মুখোমুখি হয়েছে হক আর বাতিল। একপাশে আবু জাহেলের নেতৃত্বে এক হাজার সশস্ত্র সুসজ্জিত বাহিনী, অন্যপাশে মাত্র ৩১৩ জন অল্পপ্রাণ মুসলিম। কিন্তু সেই মুসলিম বাহিনীর ভিড়ে লুকিয়ে ছিল দুই সাহসী কিশোর—মুআজ ও মুআওয়িজ।
তাদের মা আফরা বিনতে উবাইদ (রা.) ছিলেন সেই মহীয়সী নারী, যার সাত সন্তানই সেদিন বদরের ময়দানে লড়াই করতে এসেছিলেন। মুআজ ও মুআওয়িজের কানে তখন কেবল একটি কথাই বাজছিল—‘আবু জাহেল আমাদের প্রিয় নবীজিকে (সা.) গালমন্দ করেছে, মক্কায় তাঁকে অবর্ণনীয় কষ্ট দিয়েছে।’ তারা শপথ করেছিল, আজ হয় আবু জাহেল মরবে, নয়তো তারা শহিদ হবে।
যুদ্ধ শুরু হলো। তলোয়ারের ঝনঝনানি আর ঘোড়ার হ্রেষা রব চারদিকে। প্রখ্যাত সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) যুদ্ধের সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ অনুভব করলেন তাঁর দুই পাশে ছোটখাটো দুজন ছেলে। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, এই বিপদের মুখে ডানে-বামে যদি শক্তিশালী কেউ থাকত!
ঠিক তখনই এক কিশোর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘চাচা, আপনি কি আবু জাহেলকে চেনেন?’ আবদুর রহমান ইবনে আউফ অবাক হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ ভাতিজা, চিনি। কিন্তু তাকে দিয়ে তোমার কী কাজ?’
কিশোরটি দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিল, ‘চাচা, আমি শুনেছি সে নাকি আমার নবীজিকে গালমন্দ করেছে! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তাঁর কসম—আজ তাকে দেখা মাত্রই আমি আক্রমণ করব। আমাদের দুজনের মধ্যে যার হায়াত আগে শেষ হবে, সে-ই আজ মরবে।’
অন্য পাশ থেকে দ্বিতীয় কিশোরটিও একই কথা বলল। আবদুর রহমান ইবনে আউফ তাদের সাহস দেখে চমকে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দূরে জনসমুদ্রের মাঝে দাম্ভিক আবু জাহেলকে দেখতে পেলেন। তিনি আঙুল উঁচিয়ে ইশারা করলেন, ‘ওই যে দেখো তোমাদের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি!’
ইশারা পাওয়া মাত্রই যেন দুটি বাজপাখি তাদের শিকারের দিকে ডানা মেলল। ভিড় ঠেলে, রক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা আবু জাহেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুআজের এক প্রচণ্ড কোপে আবু জাহেলের পায়ের গোছা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ল।
এদিকে ছোট ভাই মুআওয়িজ আবু জাহেলের ওপর চড়ে বসে তার গলায় ছুরি চালাতে থাকল। আবু জাহেল নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ল।
যুদ্ধ শেষ হলো। বাতিলের দম্ভ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে মুসলমানরা বিজয়ী হলেন। ৭০ জন মুশরিক নিহত আর ৭০ জন বন্দী হলো। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে যখন আবু জাহেলের মৃত্যুর খবর এল, তিনি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন।
দুই কিশোরের নবীপ্রেম আর বীরত্বের গল্প শুনে নবীজি (সা.) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তিনি তাদের কাছে ডাকলেন, পরম মমতায় দোয়া করলেন।
আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) মুগ্ধ হয়ে বলতেন, ‘সেদিন ওই দুই কিশোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি যে আনন্দ আর গর্ব বোধ করেছিলাম, তা আর কখনোই পাইনি।’
ইতিহাসের পাতায় আবু জাহেল এক অভিশপ্ত নাম হিসেবে রয়ে গেল, আর মুআজ ও মুআওয়িজ অমর হয়ে রইল ভালোবাসার এক জ্বলন্ত মশাল হিসেবে—যারা প্রমাণ করেছিল, খাঁটি ভালোবাসা থাকলে বয়সের সীমাবদ্ধতা কোনো বাধাই নয়।