হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

যুদ্ধবিরতির আগে জাতিসংঘকে দিয়ে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা ট্রাম্পের, রাশিয়া-চীনের ভেটোতে ব্যর্থ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের ভয়াবহ উত্তেজনা অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে এর ঠিক আগেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ঘটে গেছে আরেক কূটনৈতিক উত্তেজনা। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাহরাইনের পক্ষ থেকে উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাবের ওপর ‘ভেটো’ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে চীন ও রাশিয়া। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটি বিশ্ব রাজনীতির প্রধান দুই শক্তির সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাতকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সসহ ১১টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। তবে স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতায় (ভেটো) প্রস্তাবটি রাজনৈতিক অচলাবস্থায় পড়ে বাতিল হয়ে যায়। আলজেরিয়া এবং গায়ানা এই ভোটদানে বিরত ছিল।

ভেটোর কারণ

রাশিয়া ও চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রস্তাবটি ইরানের প্রতি অত্যন্ত বিদ্বেষপূর্ণ, একপেশে এবং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি ফু কং সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির দিকে আঙুল তুলে বলেন, ‘যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি আস্ত সভ্যতাকে চিরতরে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছেন, তখন এ ধরনের প্রস্তাব পাস করা হলে তা বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত ভুল ও বিপজ্জনক বার্তা দেবে।’ তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনা এবং উত্তেজনা প্রশমন করা, ‘আগুনে ঘি ঢালা’ নয়।

অন্যদিকে রুশ রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া এই প্রস্তাবকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং ‘মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে একটি বিকল্প প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করছে। সেটি কেবল সামুদ্রিক নিরাপত্তা নয়, বরং সামগ্রিক সামরিক উত্তেজনা হ্রাস এবং কূটনীতির পথে ফেরার ওপর জোর দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভ

চীন ও রাশিয়ার এই পদক্ষেপকে ‘একটি নীচ অবস্থান’ হিসেবে বর্ণনা করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ইরান গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে বন্দুকের নলের মুখে জিম্মি করেছে। আর আজ চীন-রাশিয়া তাদের ভেটো প্রদানের মাধ্যমে এই অপরাধে সরাসরি অংশীদার হলো।’

ওয়াল্টজ আরও অভিযোগ করেন, ইরানের এই অবরোধের ফলে কেবল তেলের দামই বাড়ছে না, বরং কঙ্গো, সুদান এবং গাজার মতো মানবিক সংকটাপন্ন এলাকায় জরুরি ওষুধ ও ত্রাণবাহী জাহাজ পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি ‘দায়িত্বশীল দেশগুলোকে’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে জলপথটি সুরক্ষিত করার আহ্বান জানান।

প্রস্তাবের আমূল পরিবর্তনও কাজে আসেনি

চীন ও রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার আশায় বাহরাইন তাদের মূল প্রস্তাবটি কয়েক দফা সংশোধন এবং এর কঠোরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছিল। প্রস্তাবের প্রাথমিক খসড়ায় ‘যেকোনো উপায়ে’ বা ‘সামরিক শক্তি প্রয়োগের’ যে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল, তা চূড়ান্ত সংস্করণে বাদ দেওয়া হয়। এমনকি ‘বাধ্যতামূলক প্রয়োগ’ সংক্রান্ত ভাষাও নরম করা হয়েছিল।

সংশোধিত প্রস্তাবে দেশগুলোকে ‘সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে প্রয়োজনে ‘এসকর্ট’ বা নিরাপত্তা দিয়ে পার করে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবুও বেইজিং ও মস্কো তাদের অবস্থানে অনড় থাকে, কারণ তারা মনে করে এটি ইরানকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর একটি প্রাথমিক ধাপ।

ইরানের প্রতিক্রিয়া

জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি চীন ও রাশিয়ার এই সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তাদের এই পদক্ষেপ নিরাপত্তা পরিষদকে একটি নির্দিষ্ট দেশের আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হওয়া থেকে রক্ষা করেছে।’

তিনি আরও জানান, বর্তমানে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত জ্যঁ আরনল্ট তেহরানের পথে রয়েছেন। আরনল্ট ইরানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে যুদ্ধের অবসান এবং একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে আলোচনা করবেন। তবে লজিস্টিক এবং নিরাপত্তা জনিত কারণে তাঁর সফরসূচিতে শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ সূত্র।

বৈশ্বিক প্রভাব ও ইরানের ভবিষ্যৎ

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নিরাপত্তা পরিষদে এই বিভাজন এবং চীন-রাশিয়ার প্রকাশ্য সমর্থন তেহরানকে আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনায় অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রাখবে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন আন্তর্জাতিক সমর্থনের মাধ্যমে ইরানকে একঘরে করতে চাচ্ছে, তখন মস্কো ও বেইজিংয়ের এই ‘কূটনৈতিক ঢাল’ ইরানের জন্য একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আপাতত হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত না আসায় এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ল। পুরো বিশ্বের নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শান্তি নাকি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

ইরানে হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করলেন ট্রাম্প, রাজি ইসরায়েলও

ইরানে পারমাণবিক হামলার গুঞ্জন, হোয়াইট হাউসের তীব্র প্রতিবাদ

রাশিয়া ও চীনের আপত্তির পর হরমুজ প্রণালি নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাব সংশোধন

আজ রাতেই পুরো একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে: ট্রাম্প

যুদ্ধাপরাধ নাকি প্রেসিডেন্টের আদেশ অমান্য—কোন পথে যাবেন মার্কিন জেনারেলরা

ঈশ্বর সংঘাত পছন্দ না করলেও ইরান যুদ্ধে আমাদের সঙ্গে আছেন: ট্রাম্প

আমি যুদ্ধাপরাধের কেয়ার করি না: ট্রাম্প

ইরানিরা বোমার আওয়াজ শুনতে চায়, কারণ তারা মুক্তি চায়: ট্রাম্প

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নয়, টোল নেওয়া উচিৎ যুক্তরাষ্ট্রের: ট্রাম্প

ইরানকে এক রাতেই ধ্বংস করা সম্ভব, হতে পারে মঙ্গলবারই: ট্রাম্প