মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে নিরস্ত বা দুর্বল না করা পর্যন্ত এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়—এমন ধারণা এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে, বিশেষ করে, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়লেও সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই অবস্থানের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বর্তমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে গঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি নেতৃত্বের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে—ইরান দীর্ঘ মেয়াদে উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য বড় হুমকি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা গেলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত হবে। তবে সৌদি আরবের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও জরুরি। কারণ, তাদের ভৌগোলিক অবস্থান ইরানের খুব কাছাকাছি, ফলে সরাসরি হামলার ঝুঁকি বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যদি এই পথ বন্ধ করে দেয় বা নিয়ন্ত্রণে নেয়, তাহলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইতিমধ্যে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্বে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন জোরদার হলেও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে ইরানবিরোধী মনোভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান প্রকাশ্যে বলেছেন, তাঁরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক—সব ধরনের উপায় ব্যবহার করে ইরানের হামলা বন্ধ করতে চান। একই সঙ্গে তিনি ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেন, দেশটি ইসলামি বিশ্বের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থই বেশি রক্ষা করছে।
গোপনে সৌদি নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে উৎসাহ দিচ্ছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যুবরাজ সালমান নাকি মনে করেন, শুধু আংশিক সামরিক অভিযান নয়, বরং স্থল অভিযানের মাধ্যমে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো দখল এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। তাঁর মতে, যদি যুদ্ধ অর্ধেক পথে থেমে যায়, তাহলে ইরান আরও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য আরও বড় হুমকি তৈরি করবে।
তবে এই কৌশলের ঝুঁকিও কম নয়। ইরানের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে, নতুন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর উত্থান ঘটতে পারে এবং তেলের অবকাঠামো আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কৌশলগত ইস্যু নয়, এটি এখন উপসাগরীয় দেশগুলোর অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্যে ও গোপনে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, এই অঞ্চলের রাজনীতিতে বাস্তবতা, কূটনীতি ও কৌশল—তিন স্তরেই জটিল খেলা চলছে।