ইরানের চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের আশা-ভয়, অনিশ্চয়তা ও দৈনন্দিন জীবনের প্রতিফলন অপ্রত্যাশিতভাবে উঠে এসেছে এক ব্যতিক্রমী ডায়েরিতে। এই ডায়েরির লেখক আর দশজন সাধারণ নাগরিক নন—তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ইউসেফ পেজেশকিয়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নিয়মিত পোস্টগুলো কোনো রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস করে না, বরং তুলে ধরে ইরানি সমাজে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্ন, উদ্বেগ এবং ব্যক্তিগত অনুভূতির এক জটিল চিত্র।
৪৫ বছর বয়সী ইউসেফ একজন পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে দেখা করেননি বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে বাবার প্রতি তাঁর দৃঢ় আনুগত্য স্পষ্ট। একই সঙ্গে, তাঁর লেখায় উঠে এসেছে যুদ্ধের অগ্রগতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব এবং কীভাবে যুদ্ধকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যেতে পারে—তা নিয়ে ব্যক্তিগত ভাবনা।
ইরানের মতো কঠোর সেন্সরশিপের সমাজে ইউসেফের এই খোলামেলা লেখাগুলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নিজেই বলেছেন, তাঁর কাছে কোনো গোপন তথ্য নেই এবং অন্যদের আগে কিছু জেনে ফেলার বিশেষ মূল্যও দেখেন না। বরং তিনি টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকেই খবর সংগ্রহ করেন—ঠিক যেমনটা করেন একজন সাধারণ নাগরিক।
ডায়েরির একটি এন্ট্রিতে ইউসেফ লিখেছেন, ‘দুপুরে ক্ষেপণাস্ত্রের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, আর বৃষ্টি হচ্ছিল। তেহরানের আবহাওয়া বসন্তের মতো সুন্দর হয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, যদি একটা ক্যামেরা থাকত, শহরের এই সৌন্দর্য ধারণ করতাম। যদি যুদ্ধ না থাকত, স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে পারতাম।’
এই বর্ণনা যুদ্ধের মধ্যেও জীবনের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে। তবে তাঁর লেখায় ক্ষোভও আছে—বিশেষ করে সরকারের আরোপিত ইন্টারনেট বন্ধ, সংবাদ সেন্সরশিপ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে তাঁর বাবার ক্ষমা চাওয়া নিয়ে।
এক বন্ধুর সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের বর্ণনায় উঠে এসেছে যুদ্ধের আতঙ্ক। বন্ধুটি স্বপ্নে দেখেছিলেন, তাঁদের বাড়ির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে এবং পরদিন সত্যিই তাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। ইউসেফ লেখেন, “গল্পটি বলতে বলতে তার হাত কাঁপছিল। আমি বললাম, ‘তোমার স্বপ্নকে জিজ্ঞেস করো, যুদ্ধের ভবিষ্যৎ আর কী।’ আমরা হেসে উঠলাম—উদ্বেগের মাঝেও এই হাসির কারণ খুঁজে নেওয়া যায়।”
যুদ্ধ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রসঙ্গেও ইউসেফ সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। এই যুদ্ধ সমাপ্তির দৃশ্যপট নিয়ে ভাবার আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমরা কত দিন লড়ব? চিরকাল? ইসরায়েলের সম্পূর্ণ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত? নাকি নিজের ধ্বংসের মুখে পৌঁছানো পর্যন্ত?’
তিনি আরও লিখেছেন—সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তথ্য জরুরি। ইরানের অস্ত্র মজুত কত দিন চলবে, শত্রুপক্ষ কত দিন যুদ্ধ চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে—এসব বিশ্লেষণ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হবে—কার সহনশীলতা বেশি।
ইউসেফ তাঁর লেখায় ইরানের অবস্থানকে সঠিক বলেই মনে করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ইরান কি পারমাণবিক বোমা বানাতে চেয়েছিল? আমেরিকাকে আক্রমণ করতে চেয়েছিল? সরকার কি ৪০ হাজার মানুষ হত্যা করেছে?’
এই প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে তিনি পশ্চিমা বর্ণনাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং বলেন, ‘যখন এক পক্ষ বারবার মিথ্যা বলে, তখন তাদের বিশ্বাস করব কেন?’
তবে তিনি স্বীকার করেন, ইরানেরও ভুল আছে। তিনি লিখেছেন, ‘আমরা নিখুঁত নই, ভুল করেছি। কিন্তু সেই ভুল এত বড় নয় যে এই যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেয়।’
তাঁর ডায়েরিতে গুজব ও খবরের প্রতিক্রিয়াও উঠে এসেছে। যেমন, খার্গ দ্বীপে হামলার কিংবা আলী লারিজানির মৃত্যুর খবর তাঁকে নাড়িয়ে দেয়। তিনি লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করতে চাইনি। যদি আমরা হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে না পারি, তাহলে আমরা হেরে যাব।’
এ ছাড়া, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বাবার নীতির পক্ষে তিনি কথা বলেন। তিনি এটিকে ‘নৈতিক দায়িত্ব’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, যুদ্ধ শেষে ইরানের প্রতিবেশীদেরই প্রয়োজন হবে।
ইউসেফ বিশ্বাস করেন—সহনশীলতার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যই ইরানকে রক্ষা করতে পারে। তাঁর মতে, ইরানের মনোবল ভেঙে পড়েনি এবং দেশটি আরও কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।
তবে তাঁর ডায়েরির সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশটি ব্যক্তিগত। ১৯ দিনের যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। দাদির সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখেন, যুদ্ধের বাস্তবতা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। পরে সব জেনে তিনি শোকাহত হন। ইউসেফ তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘সবকিছু স্বাভাবিক আছে।’ কিন্তু বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তিনি নিজেই ভেঙে পড়েন। তাঁর শেষ কথাটি যেন পুরো ডায়েরির সারাংশ হয়ে যায়—‘কিছুই স্বাভাবিক নয়।’