ইরানের সর্বোচ্চ নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন তাঁর ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মোজতবা খামেনি। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও শারীরিক জটিলতা নিয়ে বিভিন্ন গোপন নথি এবং চাঞ্চল্যকর তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উইকিলিকসের প্রকাশিত মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তা অনুযায়ী, মোজতবা একসময় গুরুতর ‘যৌন অক্ষমতা’য় ভুগছিলেন, যার জন্য তাঁকে লন্ডনে একাধিকবার চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
২০০০ সালে প্রকাশিত উইকিলিকসের শেষের দিককার কিছু নথি অনুযায়ী, মোজতবা খামেনি লন্ডনের ওয়েলিংটন ও ক্রোমওয়েল হাসপাতালে অন্তত চারবার চিকিৎসা নেন। তাঁর স্ত্রীর গর্ভধারণে জটিলতা দেখা দেওয়ায় একবার তিনি টানা দুই মাস ক্লিনিকে ভর্তি ছিলেন।
কূটনৈতিক তারবার্তায় বলা হয়েছে, মোজতবার পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত সন্তান প্রত্যাশা করা হয়েছিল, কিন্তু চিকিৎসার জন্য তাঁকে চতুর্থবার যুক্তরাজ্য সফর করতে হয়। দুই মাস অবস্থানের পর তাঁর স্ত্রী শেষ পর্যন্ত অন্তঃসত্ত্বা হন।
এই তারবার্তায় আরও দাবি করা হয়েছে, সাবেক মজলিস স্পিকার হাদ্দাদ আদেলের মেয়ের সঙ্গে বিয়ের আগে মোজতবা খামেনি ইসলামি আইন অনুযায়ী দুটি ‘অস্থায়ী বিয়ে’ (মুতা বিবাহ) করেছিলেন। পরে বেশ দেরিতে তিনি স্থায়ীভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। উল্লেখ্য, গত শনিবার তেহরানে ইসরায়েলি হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আলী খামেনির পাশাপাশি মোজতবার স্ত্রী ও এক পুত্রও নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, ১৯৬৯ সালে জন্ম নেওয়া মোজতবা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় শিশু ছিলেন। ১৯৮৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে তিনি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসে (আইআরজিসি) যোগ দেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন। পরে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তিনি দেশের ধর্মীয় ও নিরাপত্তাকাঠামোর গভীরে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। বাবার বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ও রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষায় তিনি সব সময় পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে যান।
২০০৫ ও ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রক্ষণশীল প্রার্থীদের জয়ী করতে মোজতবা কারচুপি এবং হস্তক্ষেপ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ সালের বিক্ষোভ দমনেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল বলে সংস্কারপন্থীরা দাবি করেন।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বর্তমানে ইরানের ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টসের ওপর কট্টরপন্থীরা চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে মোজতবাকেই পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয়। তবে বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্র উৎখাত করা ইরানে খামেনির ছেলের ক্ষমতায় আসা ‘নতুন রাজতন্ত্র’ বা পারিবারিক শাসন প্রতিষ্ঠার বিতর্ক উসকে দিচ্ছে।
এদিকে মোজতবা খামেনি যদি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে তাঁর পরিণতিও বাবার মতোই হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইরানের সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যাকে মনোনীত করা হবে, তাকেই নির্মূল করা হবে। তার নাম কী বা সে কোথায় লুকিয়ে আছে, তা বড় কথা নয়; সে হবে আমাদের লক্ষ্যবস্তু।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, খামেনির সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের প্রায় সবাই শনিবারের হামলায় নিহত হয়েছেন। ফলে ইরানের নেতৃত্বে এমন কেউ আসতে পারেন, যাঁকে আগে কেউ ভাবেনি। তবে তেহরানের কট্টরপন্থীরা মোজতবার মাধ্যমেই খামেনির আদর্শ ধরে রাখতে মরিয়া। আগামী সপ্তাহেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।