ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছে কাতারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র ‘রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি’। আজ বৃহস্পতিবার ভোরে ইরানের ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র এই শিল্পনগরে আঘাত হানলে বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন স্থাপনা ও পার্ল গ্যাস-টু-লিকুইড (জিটিএল) প্ল্যান্টের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কাতার এনার্জির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
এই হামলার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কাতার এনার্জি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বুধবারের পর বৃহস্পতিবার ভোরেও ধারাবাহিক হামলার অংশ হিসেবে এলএনজি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হলেও জরুরি উদ্ধারকারী দল দ্রুত সাড়া দেওয়ায় এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, ইরানের দক্ষিণ পার্স ও আসালুয়েহ গ্যাস ক্ষেত্রে ইসরায়েলি বিমান হামলার সরাসরি প্রতিশোধ নিতেই তেহরান এই হামলা চালিয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি ও গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিবসহ তিন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন। ইরানের দাবি, তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টার পাল্টা জবাব হিসেবে তারা কাতারের এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রটি বেছে নিয়েছে।
দক্ষিণ পার্স গ্যাস ফিল্ডটি ইরান ও কাতার যৌথভাবে ব্যবহার করে (কাতারে এটি ‘নর্থ ফিল্ড’ নামে পরিচিত)। এটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র, যা এক দশকেরও বেশি সময় বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো হামলা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।
সুর নরম ডোনাল্ড ট্রাম্পের
হামলার পরপরই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর অবস্থান কিছুটা নরম করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইসরায়েল যে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে হামলা চালাবে তা যুক্তরাষ্ট্র আগে জানত না। ট্রাম্প ইসরায়েলকে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে এই স্থাপনায় আর কোনো আক্রমণ চালানো হবে না।
ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টে উল্লেখ করেছেন, কাতারে ইরানি হামলাটি একটি ‘ভুল বোঝাবুঝি’ এবং এটি ‘অযৌক্তিক’। তবে ইরানকে সতর্ক করে তিনি লিখেছেন, ‘ইরান যদি কাতারের মতো কোনো নিরপরাধ দেশে পুনরায় হামলা চালানোর বোকামি করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের গ্যাস অবকাঠামোতে বিশাল সামরিক অভিযান চালাবে।’
কাতার যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং রাস লাফান হলো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি রপ্তানি কেন্দ্র। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা বিশ্ব অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংঘাত আরও বৃদ্ধি পেলে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানাগুলোতে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।