যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে একটি চুক্তির কাঠামোতে সম্মতির খবর প্রকাশ্যে আসার পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ঘোষণা দিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, লেবাননের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ইরান যদি ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়, তাহলে তেহরানকে ‘পূর্ণ শক্তিতে’ আঘাত করা হবে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের খবরে বলা হয়েছে, আজ সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে কাৎজ বলেছেন, ইসরায়েল কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক বা কূটনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। এমন অবস্থান এসেছে এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি নতুন কাঠামোগত চুক্তিতে সম্মত হয়েছে বলে মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সমঝোতার অংশ হিসেবে লেবাননেও শত্রুতা বন্ধের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এদিকে, চুক্তি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের কট্টর ডানপন্থী সদস্যরা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তির শর্তে আবদ্ধ নয়। বিপরীতে বিরোধী নেতারা অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু দেশের নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
আজ সোমবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ শেষ করতে একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছানো হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিনের আলোচনা শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
ইরান ও পাকিস্তানের সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাতেও যুদ্ধবিরতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই যুদ্ধ শুরু করেছিল ইসরায়েল, তবু এই চুক্তি নিয়ে আলোচনায় তাদের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। এছাড়া যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই এই চুক্তিতে প্রতিফলিত হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে।
সেসব লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমিয়ে আনা, সশস্ত্র মিত্রগোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনের জন্য উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি করা।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সোমবার তুরস্ক, ইরাক ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথক ফোনালাপে বলেন, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধ সমাপ্তির কাঠামোগত চুক্তি বাস্তবায়নের দায়ও যুক্তরাষ্ট্রের বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
তবে এসব আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে কাৎজ বলেন, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সরে যাবে না এবং সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাবে, ‘বিদ্যমান সব চাপ এবং ভবিষ্যতে আসা সম্ভাব্য চাপ সত্ত্বেও।’ বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তিনি এমন একটি নীতি অনুসরণ করছেন, যার অধীনে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবানন, সিরিয়া ও গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলে অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করবে।
কাৎজের ভাষ্য অনুযায়ী, এই উপস্থিতির উদ্দেশ্য সীমান্ত ও ইসরায়েলি জনগোষ্ঠীকে ‘জিহাদি উপাদান’ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। তিনি আরও বলেন, এসব নিরাপত্তা অঞ্চল স্থানীয় বাসিন্দামুক্ত করা হবে এবং ভূমির ওপরে ও নিচে থাকা সব ‘সন্ত্রাসী অবকাঠামো’ ধ্বংস করা হবে। সীমান্তঘেঁষা যেসব বাড়ি সশস্ত্র ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলোও ধ্বংস করা হবে। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থ ও নাগরিকদের সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করবে না এবং নিরাপত্তা অঞ্চলগুলো থেকেও সরে যাবে না। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, লেবাননের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান যদি ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়, তাহলে ইসরায়েল ‘পূর্ণ শক্তিতে’ পাল্টা আঘাত করবে।
গত সপ্তাহে বৈরুতে আইডিএফ হামলার পর ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। রোববারও তারা একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে বলে হুমকি দিয়েছিল। তবে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে ইরান আপাতত সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর সোমবার সকালে ইসরায়েলে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। দেশটির কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যতামূলক নয়।’ তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অধীন নয় এবং দেশটি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাঁর ভাষায়, এই চুক্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না এবং লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী যে ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, সেখান থেকে সরে আসা উচিত হবে না।
অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ বলেন, ‘এই চুক্তি ইসরায়েলের জন্য এবং পুরো মুক্ত বিশ্বের জন্য খারাপ। একদম পরিষ্কার।’ আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ইয়াশার জোটের নেতা গাদি আইজেনকটও কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের সামনে এসে কঠিন প্রশ্নগুলোর সৎ ও সত্য উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েলের নাগরিকরা আবারও বিদেশি নেতাদের বক্তব্যের মাধ্যমে এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির বিষয়ে জানতে বাধ্য হয়েছেন।
আইজেনকটের মতে, এই চুক্তি ইসরায়েলের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি আরও বলেন, উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দারা, যারা আড়াই বছর ধরে নিজেদের অবহেলিত মনে করছেন, তারা এখন দেখছেন যে তাঁদের ঘরবাড়ি ও নিরাপত্তা এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে এবং আবারও জেরুজালেম তাঁদের উদ্বেগের প্রতি সাড়া দেয়নি। তবে তাঁদের একা ফেলে দেওয়া হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।