দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইরানি রেজিমের বিকল্প হিসেবে রেজা শাহ পাহলভিকে দেখতেন—এমন অনেক ইরানি এখন নির্বাসিত এই নেতার ওপর আস্থা হারাতে শুরু করেছেন। এমনটাই উঠে এসেছে লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে।
তেহরানের ৩৯ বছর বয়সী বাসিন্দা দিনা জানান, একসময় তিনি বিশ্বাস করতেন ইরানের শেষ শাহের ছেলে দেশটির বিভক্তবিরোধী শক্তিকে একত্র করতে পারবেন। এখন আর তিনি তা মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘তাঁর বাবার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার সামান্য অংশও যদি তাঁর থাকত! অথবা অন্তত তাঁর মায়ের প্রজ্ঞা। থাকলে তিনি বুঝতেন কীভাবে সরকারের বিরোধীদের মধ্যে জমে থাকা বিপুল শক্তিকে কাজে লাগাতে হয়।’
নিরাপত্তার কারণে দিনা এবং মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে কথা বলা অন্য সব ইরানিকে ছদ্মনামে উল্লেখ করা হয়েছে। জানুয়ারিতে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তাতে দিনাও অংশ নিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনে পাহলভি, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সবাই উৎসাহ দিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘তখন আমি আশা করেছিলাম তিনি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারবেন। কিন্তু এখন আমার মত বদলে গেছে।’
দিনা নিজ চোখে বিক্ষোভ দমনে সহিংসতা দেখেছেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে নিহতের সংখ্যা সাত হাজার বা তারও বেশি। দিনা বলেন, ‘দুই মাস আগে হাজার হাজার মানুষ তাঁর কথা শুনে রাস্তায় নেমেছিল। তাঁরা কী পেয়েছে? গুলি।’
গত রোববারও পাহলভি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ইরানিদের রাস্তায় নামতে আহ্বান জানান। তিনি পারস্য নববর্ষের আগে পালিত প্রাচীন উৎসব চাহারশানবে সুরিকে জনগণকে সংগঠিত করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চান। তাঁর দাবি, ইসলামি প্রজাতন্ত্র এই উৎসব পছন্দ করে না, তাই এটি উদ্যাপন করাই কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানানো হবে।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র আশা করেছিল ইরানের নেতৃত্বের ওপর হামলা, বিশেষ করে ২৮ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যার পর, দেশে গণ-অভ্যুত্থান শুরু হবে। কিন্তু তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সাধারণত চাহারশানবে সুরির সময় ইরানের শহরগুলোতে বিপুল জনসমাগম হয়, আগুন জ্বালানো ও আতশবাজিতে মুখর থাকে রাস্তাঘাট।
কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইরানের শহরগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্যে রয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক ইরানি বলছেন, রাস্তায় নেমে উৎসব করার আহ্বান তাদের দৈনন্দিন জীবনের ভয়াবহ বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে।
তেহরানের ২১ বছর বয়সী ছাত্র মাজিদ বলেন, তিনি আর পাহলভিকে নেতা হিসেবে দেখেন না। জানুয়ারির বিক্ষোভে তিনি নিজের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুকে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে মরতে দেখেন। তিনি শান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার চোখের সামনে তাকে গুলি করা হয়েছিল। এখনো সেটা মেনে নিতে পারিনি।’
তিনি হত্যার জন্য ইরানি কর্তৃপক্ষকে দায়ী করলেও মনে করেন বিরোধী নেতারা এমন প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন, যা কখনো পূরণ হয়নি। মাজিদ বলেন, ‘এখন তিনি বলছেন রাস্তায় নেমে উৎসব করতে। তিনি কি জানেন এখানে জীবন কেমন? মানুষ ঘুমাতে যায় এই ভয় নিয়ে যে—সকালে হয়তো জীবিত উঠবে না। বাইরে বেরোলেই ভয় লাগে, আবার কোথাও বোমা পড়বে না তো? আর এই অবস্থায় তিনি বলেন উৎসব করো?’
পাহলভি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেকেই ইরানি জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তুলেছেন। জানুয়ারির বিক্ষোভ, যা অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু হয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র পতনের দাবিতে রূপ নেয়, সে সময় এই তিনজনই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে আন্দোলনকারীদের জন্য সহায়তা আসছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ইসরায়েলি এজেন্টদের উসকানি ও অস্ত্র দেওয়ার গুজব ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালালে বিক্ষোভকারীরা কার্যত একা পড়ে যায়।
২৪ বছর বয়সী মোরতেজা একসময় পাহলভির দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই নেতা সরকারের পতন ঘটিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্রে ক্লান্ত আমাদের অনেকের কাছে তিনি একমাত্র সম্ভাব্য বিকল্প মনে হয়েছিল।’
বিক্ষোভের সময় পাহলভি বারবার মানুষকে রাস্তায় নামতে উৎসাহ দেন। মোরতেজা বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন সাহায্য আসছে। তিনি বলেছিলেন তিনি ইরানে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।’ তখন কিছু মানুষ সত্যিই বিশ্বাস করেছিল পাহলভি শিগগিরই তেহরানে হাজির হবেন, যেমন ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে এসেছিলেন। মোরতেজার ভাষায়, ‘আমরা ভেবেছিলাম কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর বিমান তেহরানে নামবে। আমরা বিশ্বাস করেছিলাম।’
তেহরানের ৪৩ বছর বয়সী মা শিরিনও বলেন, শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন পাহলভির নিশ্চয়ই কোনো কৌশল আছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মরিয়া ছিলাম। আমরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রে ক্লান্ত।’ তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে ইরানিরা নানা বিকল্পে আশা রেখেছে: সংস্কারপন্থী, সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, এমনকি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও। কিছুই ফল দেয়নি।
তাই যখন পাহলভি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিকল্পনার কথা বললেন এবং বিক্ষোভের ডাক দিলেন, তিনি ধরে নিয়েছিলেন এর পেছনে গুরুতর কোনো কৌশল আছে। শিরিন বলেন, ‘আমি বন্ধুদের সঙ্গে এ নিয়ে তর্কও করেছি।’ তাঁদের কেউ কেউ তাঁকে সতর্ক করেছিলেন বিশ্বাস না করতে। শিরিন আরও বলেন, ‘তারা বলেছিল, দেখছ না সরকার মানুষ মেরে ফেলছে? দেখছ না তিনি ইরানের বাস্তবতা বোঝেন না?’ তখন শিরিন এসব সতর্কতা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘এখন বুঝছি—তারা ঠিক ছিল। আমি ভুল ছিলাম।’
কিছু মানুষের জন্য সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের পুরোনো সন্দেহকে আরও জোরদার করেছে। উত্তর ইরানের গোরগান শহরের ৪০ বছর বয়সী আমির বলেন, পাহলভির সমালোচকেরা এখন বেশি খোলামেলা কথা বলছেন। তিনি বলেন, ‘আগে তাঁর সমালোচনা করলে সমর্থকেরা সঙ্গে সঙ্গে আপনাকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের এজেন্ট বলত। এখন সেই পরিবেশ বদলেছে।’ আমিরের মতে, পাহলভির রাজনৈতিক অবস্থান প্রায়ই অসংগতিপূর্ণ মনে হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিনি কখনো যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানি জনগণকে সহায়তা করতে বলেছেন, আবার কখনো বলেছেন বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। আমির বলেন, এসব পরিবর্তন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো ইরানের ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখছে তা নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প যখনই এমন কিছু বলেন যাতে বোঝা যায় তিনি পাহলভিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, তখনই পাহলভি বলেন ইরানিদের বিদেশি সাহায্যের দরকার নেই। কিন্তু যখন তিনি আশঙ্কা করেন বিদেশি শক্তি বর্তমান সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করবে বা অন্য কাউকে বেছে নেবে, তখন আবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশংসা শুরু করেন।’
যুদ্ধের সময় নিহতদের বিষয়ে পাহলভির প্রতিক্রিয়াও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর তিনি হামলায় নিহত মার্কিন সেনাদের প্রতি শোক প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সমালোচকদের অভিযোগ, ইরানে নিহত বেসামরিকদের বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। এর মধ্যে দক্ষিণের মিনাব শহরে একটি স্কুলে ডাবল-ট্যাপ হামলায় বহু শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
দিনার কাছে এই বৈপরীত্য বেদনাদায়ক ছিল। তিনি বলেন, ‘যে মানুষ নিজেকে ইরানি জনগণের প্রতিনিধি বলে দাবি করেন, তিনি শিশু হত্যার সময় নীরব থাকেন কীভাবে? কিন্তু বিদেশি সৈন্যদের জন্য দ্রুত শোক প্রকাশ করেন।’
পাহলভির নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক এমন এক সময়ে চলছে যখন ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। কর্তৃপক্ষ নতুন বিক্ষোভের বিরুদ্ধে স্পষ্ট সতর্কতা দিয়েছে। জাতীয় পুলিশ প্রধান আহমদ রেজা রাদান ১১ মার্চ বলেন, জনগণ যদি শত্রুর আহ্বানে রাস্তায় নামে, নিরাপত্তা বাহিনী ‘গুলি চালাতে প্রস্তুত’। তিনি সতর্ক করেন, এমন বিক্ষোভে অংশ নেওয়া যে কারও সঙ্গে ‘শত্রুর মতো’ আচরণ করা হবে। অনেক ইরানি মনে করেন, এসব হুমকি জনসমাবেশকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
সমালোচনা সত্ত্বেও, ইসলামি প্রজাতন্ত্র পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকারের সম্ভাব্য নেতা হিসেবে কিছু ইরানি এখনো পাহলভিকে সমর্থন করেন। কিন্তু সরকারের সমালোচকদের মধ্যেই বিভাজন বাড়ছে। দুটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—কেউ যারা একসময় তাকে একমাত্র বিকল্প মনে করতেন তারা হতাশ হচ্ছেন। অন্যদিকে যারা আগে থেকেই সন্দিহান ছিলেন তারা এখন প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন।
আমির বলেন, পাহলভি নিয়ে বিতর্ক নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। তিনি থেমে বলেন, ‘তিনি এত ভুল করেছেন যে এখন তাকে সমালোচনা করলেও আগের মতো মূল্য দিতে হয় না। তবু এর মানে এই নয় যে পরিস্থিতি ভালো হয়েছে। আমরা শুধু আটকে আছি। একেবারে অচল এক গলিপথে।’