হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের যেসব ঐতিহাসিক স্থাপনা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফালাক উল আফলাক দুর্গ। ছবি: উইকিপিডিয়া

ইরানের ইতিহাস জয়-পরাজয়, সাংস্কৃতিক নবজাগরণ এবং শিল্পকুশলতার স্তরে স্তরে গড়া; যার প্রতিফলন দেখা যায় দেশটির বিস্ময়কর ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোতে। কিন্তু মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর তুলে এনেছে।

ইস্পাহানের আইকনিক ফিরোজা গম্বুজ এবং সারা দেশের মসজিদ ও প্রাসাদের সূক্ষ্ম অলংকৃত অভ্যন্তর আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। ইরানের স্থাপত্য ঐতিহ্য মোটামুটি দুই যুগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি প্রাক্-ইসলামিক সময়, যখন আকিমেনীয় ও সাসানীয়দের মতো ইরানি সাম্রাজ্যগুলো শাসন করত। দ্বিতীয়টি ইসলামী যুগ, যা খোলাফায়ে রাশেদার মাধ্যমে শুরু হয়ে একাধিক ইসলামি সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতায় ২০শ শতকের শুরুর দিকে কাজার রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত।

ইউনেসকোর স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় ইরানের ২৯টি স্থান রয়েছে—সংখ্যার বিচারে যা বিশ্বে দশম সর্বোচ্চ। কিন্তু গত আড়াই সপ্তাহে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় এসব স্থাপনার অনেকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইস্পাহান থেকে তেহরান এবং খোররামাবাদ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইউনেসকো তালিকাভুক্তসহ বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এক ইরানি কর্মকর্তা এসব হামলাকে ‘একটি সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সমান’ বলে মন্তব্য করেছেন।

মিডল ইস্ট আই ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্থানগুলোর ব্যাপারে কিছু তথ্য তুলে এনেছে। স্থানগুলো হলো—

ক্ষতিগ্রস্ত গুলেস্তাঁ প্রাসাদ। ছবি: এক্স

গুলেস্তাঁ প্রাসাদ

সংঘাতের দ্বিতীয় দিন ১ মার্চ তেহরানের একমাত্র ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান গুলেস্তাঁ প্রাসাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিকটবর্তী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিস্ফোরণে প্রাসাদের জানালা ভেঙে যায় এবং জটিল আয়না ও কাচের অলংকরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে। তেহরানের পর্যটন ও ঐতিহ্য কমিটির প্রধান সাইয়্যেদ আহমাদ আলাভি জানান, বিস্ফোরণে ঐতিহাসিক ওরসি দরজাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাসাদের প্রাঙ্গণের কিছু অংশের পিচও উঠে গেছে।

গুলেস্তান প্রাসাদ মূলত ১৪শ শতকে সাফাভি আমলে নির্মিত হয়। বর্তমান স্থাপত্যের বেশির ভাগ বৈশিষ্ট্য ও অলংকরণ ১৯শ শতকের কাজার আমলের, যখন এটি রাজবংশের সরকারি আসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কাজাররা ১৭৮৬ সালে তেহরানকে দেশের রাজধানী ঘোষণা করে।

প্রাসাদ কমপ্লেক্সে আটটি প্রাসাদ ভবন রয়েছে, যার বেশির ভাগ এখন জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর সঙ্গে রয়েছে প্রাচীরঘেরা একটি বাগান।

চেহেল সেতুন প্রাসাদ

ইস্পাহানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে চেহেল সেতুন প্রাসাদ (চল্লিশ স্তম্ভ)। ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, প্রাসাদের দরজা ভেঙে গেছে, জানালা চূর্ণ হয়েছে এবং চারদিকে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে। সাফাভি শাহ আব্বাস প্রথমের নির্দেশে নির্মিত এই স্থাপনাটি যুদ্ধদৃশ্য ও রাজকীয় অভ্যর্থনার ফ্রেস্কোচিত্রের জন্য বিখ্যাত। আব্বাস প্রথমকে প্রায়ই ‘আব্বাস দ্য গ্রেট’ বলা হয়।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ১৭শ শতকের একটি ফ্রেস্কোর মাঝখান দিয়ে বড় ফাটল নেমে গেছে। ছবিটিতে সাফাভি শাহ তাহমাসপ মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে ইরানে স্বাগত জানাচ্ছেন—এমন দৃশ্য আঁকা ছিল। এই প্রাসাদের বাগান ইরানের ৯টি ঐতিহাসিক বাগানের অংশ, যেগুলো সম্মিলিতভাবে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

আলী কাপু প্রাসাদ

চেহেল সেতুনের কাছেই অবস্থিত আলী কাপু প্রাসাদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রাসাদের দরজা ও জানালা ভেঙে গেছে। ইস্পাহানের নকশে জাহান স্কোয়ারের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর অংশ হিসেবে আলী কাপু ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত।

প্রাসাদটি প্রথম ১৫৯৭ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ছয়তলা এই ভবনে সূক্ষ্ম ইনলে কাজ করা অলংকৃত ছাদ, অসংখ্য চিত্রকর্ম এবং ফ্রেস্কো রয়েছে।

ইস্পাহানের ঐতিহাসিক জামা মসজিদ। ছবি: তাসনিম নিউজ

জামে মসজিদ

ইস্পাহানের একটি ঐতিহাসিক মসজিদও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৯ মার্চের এক বিস্ফোরণে জামে মসজিদের ফিরোজা টাইল ভেঙে মাটিতে পড়ে যায় বলে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে। প্রতিবেদনে ইরানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ছবি উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে মসজিদের পেছনে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। এই স্থানে প্রথম মসজিদ নির্মিত হয় অষ্টম শতকের শেষ দিকে আব্বাসীয় আমলে। এক শতাব্দী পরে এটি পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং পরবর্তী এক হাজার বছরে বারবার সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এটি পারস্য ও ইসলামী স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।

দৌলত খানেহ/দৌলতখানা

দুই প্রাসাদ ও ঐতিহাসিক মসজিদ ছাড়াও রয়্যাল প্রিসিঙ্কট বা দৌলত খানেহ এলাকার আরও কয়েকটি স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। একটি শিল্পবিষয়ক পত্রিকার প্রতিবেদনে স্থানীয় সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ১৭শ শতকের রাকেব খানেহ প্যাভিলিয়ন (জকির বাড়ি) ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সাফাভি দরবারের আবাসিক স্থাপনা আশরাফ হলও আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তৈমুরীয় আমলের তৈমুরি হল, যা পরে ইরানের প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফালাক-উল-আফলাক দুর্গ

লোরেস্তান প্রদেশের খোররামাবাদ অঞ্চলের ফালাক-ওল-আফলাক দুর্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর নির্মাণকাল সাসানীয় যুগ (তৃতীয় থেকে সপ্তম শতক) পর্যন্ত পুরোনো। ইরানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৮ মার্চ ইসরায়েলি বিমান হামলা দুর্গসংলগ্ন এলাকায় আঘাত হানে। হামলার লক্ষ্য ছিল লোরেস্তানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিভাগের ভবন, যা ধ্বংস হয়ে যায়।

বিস্ফোরণে দুর্গের প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতত্ত্ব জাদুঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে এক স্থানীয় কর্মকর্তা জানান। পাশাপাশি ব্যারাক, রেজিমেন্ট ভবন এবং অন্যান্য স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে লোরেস্তানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিভাগের প্রধান আতা হাসানপুর বলেন, ‘সৌভাগ্যক্রমে ফালাক-ওল-আফলাক দুর্গের মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।’

মস্কোতে মোজতবা খামেনির চিকিৎসা নেওয়ার খবর ‘ভিত্তিহীন’ বললেন ইরানের রাষ্ট্রদূত

স্টারলিংকের শতাধিক ডিভাইস জব্দ করল ইরান

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল পরাজয় স্বীকারের আগে আলোচনা নয়: আয়াতুল্লাহ মোজতবা

লারিজানির মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা: এক্স হ্যান্ডলে চিরকুট ঘিরে রহস্য

কে এই আলী লারিজানি, যাঁকে হত্যার দাবি করছে ইসরায়েল

ইরানের বাসিজ কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানিকে হত্যার দাবি ইসরায়েলের

ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানি নিহত, দাবি ইসরায়েলের

ইরানি সমাজে সামান্য আস্থাও হারাতে শুরু করেছেন রেজা পাহলভি

ঈদুল ফিতর ও তার পরেও আল-আকসা মসজিদে মুসলমানদের ঢুকতে দেবে না ইসরায়েল

ইরান এতগুলো দেশে হামলা চালাবে ভাবিনি, আমরা হতবাক: ট্রাম্প