হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

যুক্তরাষ্ট্রে আস্থা নেই, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছে আরবরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইরানি হামলার পর আগুন ধরে যায় দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ছবি: এএফপি

টানা ছয় সপ্তাহের বিরামহীন হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন চলছে নতুন করে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের তীব্র প্রতিযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ভঙ্গুর অস্ত্রবিরতি চললেও এই অঞ্চলের মার্কিন মিত্ররা—যারা কি না মার্কিন অস্ত্রশস্ত্রের অন্যতম প্রধান ক্রেতা—এখন বিকল্প ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বিশ্বজুড়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দ্রুত শক্তিশালী করতে তারা নিত্যনতুন উদ্ভাবনী পথের দিকে ঝুঁকছে।

সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন দক্ষিণ কোরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, মাঝ আকাশে লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করতে সক্ষম ইউক্রেনীয় ড্রোন এবং ঐতিহ্যবাহী মার্কিন গ্যাটলিং গানের দিকে নজর দিচ্ছে। পাশাপাশি তারা স্টার্টআপগুলোর কাছ থেকে নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে ব্রিটেনের ‘ক্যামব্রিজ অ্যারোস্পেস।’ গত শুক্রবার যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ছোট ও কমদামি ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে, যা মূলত ড্রোন ও অন্যান্য গোলাবারুদ ধ্বংস করার জন্য তৈরি।

এই তোড়জোড় থেকে স্পষ্ট যে, ইরানের পাল্টা হামলার ব্যাপকতা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে অবাক করে দিয়েছে। বিশেষ করে শাহেদের মতো সস্তা ড্রোনগুলো যেভাবে ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ চালাচ্ছে, তা মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এটি আরও উন্মোচিত করেছে যে, চার বছর আগে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর থেকে অস্ত্রের চাহিদা ব্যাপক বাড়লেও সেই তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়েনি। এর ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প বড় ধরনের সম্ভাব্য ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।

সমরাস্ত্র বাজার বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান বার্নস্টাইনের বিশ্লেষক অ্যাড্রিয়েন র‍্যাবিয়ার বলেন, ‘নতুন উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিনিয়োগ শুরু হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বর্তমান চাহিদা মেটানোর জন্য তা পর্যাপ্ত নয়।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সৌদি আরব প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর প্রস্তুতকারক জাপানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এ ছাড়া তারা দক্ষিণ কোরিয়ার ‘হানওয়া’ ও ‘এলআইজি নেক্স১’ কোম্পানিকে তাদের এম-স্যাম সিস্টেমের ক্রয়াদেশ এগিয়ে আনার অনুরোধ জানিয়েছে। এম-স্যাম হলো মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ব্যবস্থা, যা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান ভূপাতিত করতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার এক আইনপ্রণেতা জানান, আরব আমিরাত ইতিমধ্যেই ইরানের গোলাবারুদ ধ্বংসে এটি ব্যবহার করেছে।

রিয়াদ ইউক্রেনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে, যার মূল লক্ষ্য হলো অস্ত্র উৎপাদন ও অভিজ্ঞতা বিনিময়। কাতারও ইউক্রেনের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি করেছে। সম্প্রতি কাতারি কর্মকর্তারা ইউক্রেনের ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন এবং দেশটির অন্যতম শীর্ষ প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইউক্রেনের কাছে ‘বৈচিত্র্যময়, সমন্বিত ও বহুমুখী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা’ এবং ‘গোলাবারুদের শক্তিশালী কৌশলগত মজুত’ রয়েছে। সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা মার্কিন সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছি, তবে অন্যান্যদের সঙ্গেও আমাদের চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি ইউক্রেনের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তির কথা উল্লেখ করেন।

কাতার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে কাতারি কর্মকর্তারা জনসম্মুখে বলেছেন—তাদের মজুত ফুরিয়ে যায়নি এবং তারা আত্মরক্ষায় পুরোপুরি প্রস্তুত। ইউক্রেনীয় কোম্পানি ও সামরিক ইউনিটগুলো জানিয়েছে, উপসাগরীয় কর্মকর্তারা তাদের কাছে ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ও ইলেকট্রনিক-ওয়ারফেয়ার সরঞ্জাম চেয়েছেন। তবে ইউক্রেনীয় অস্ত্র নির্মাতাদের হাতে অতিরিক্ত সরঞ্জাম নেই বললেই চলে।

ওয়াইল্ড হরনেটস নামে একটি প্রতিষ্ঠান মাসে ১০ হাজারেরও বেশি ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরি করলেও তারা জানায়, ইউক্রেনের নিজস্ব চাহিদাই অনেক বেশি। এ ছাড়া রপ্তানির জন্য সরকারি অনুমোদনেরও প্রয়োজন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা যে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, সেটিই সংকটের মূল কারণ। ট্রাম্প প্রশাসন আরব আমিরাত, কুয়েত ও জর্ডানের কাছে ২৩ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার মধ্যে প্যাট্রিয়ট পিএসি-৩ ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে। কিন্তু এই সরঞ্জামগুলো সরবরাহ করতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। বর্তমানে প্রায় ২০টি দেশ প্যাট্রিয়ট সিস্টেম ব্যবহার করে, কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এর মজুত প্রায় শেষ। সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, তারা প্যাট্রিয়ট সিস্টেমের ক্রয়াদেশ বাতিলের কথা ভাবছে, কারণ সরবরাহে দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে।

তবে দ্রুত সরবরাহযোগ্য এবং কম প্রযুক্তির কিছু বিকল্পও রয়েছে। সমরাস্ত্র উৎপাদক কোম্পানি রেথিয়ন বিজনেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেনিফার গটিয়ার জানান, তাদের ফ্যালাঙ্কস গ্যাটলিং গান নিয়ে অনেক দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। ট্রাকের ওপর বসানো যায় এমন গুলি-ভিত্তিক অস্ত্রগুলো ইউক্রেনে ড্রোন মোকাবিলায় সস্তা ও কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এখন বিকল্প খুঁজে নেওয়াই একমাত্র সমাধান। গত মাসে বাকিংহাম প্যালেসের কাছে এক ব্রিটিশ সেনা ব্যারাকে কয়েকটি উপসাগরীয় রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি মন্ত্রী লুক পোলার্ড নির্বাহীদের কাছে জানতে চান, ‘আগামী ৩০,৬০ বা ৯০ দিনের মধ্যে আপনারা কী সরবরাহ করতে পারবেন?’

সংশ্লিষ্টরা জানান, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু নির্বাহীদের পাল্টা প্রশ্ন ছিল—একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা তারা কীভাবে সামাল দেবেন? এই ডামাডোলে নতুন প্রতিরক্ষা স্টার্টআপগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জোহানেস পিনলের কোম্পানি মার্স সিগন্যাল জ্যামিং ও গুলি-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা সফটওয়্যার বিক্রি করে। তাঁর কোম্পানি ইরান যুদ্ধ শুরুর পরপরই এই অঞ্চলের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে বার্তা পান। সেই কর্মকর্তা সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন, ‘আমাদের দ্রুত আরও সরঞ্জাম প্রয়োজন, আপনাদের সংগ্রহে এই মুহূর্তে কী কী আছে?’

তথ্যসূত্র: ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে ‘ইলেকট্রনিক্যালি’

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য চুক্তির সঙ্গে ২০১৫ সালের চুক্তির যত মিল–অমিল

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের প্রত্যাখ্যান—যুদ্ধবিরতি চুক্তি আজ আদৌ হবে কি

রোববারই চুক্তি সই হবে—ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান আইআরজিসির

জুলাই মাসে দাফন করা হবে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে

হামলা না করার শর্তে ইরানকে বিপুল টাকা দিয়েছে আমিরাত, ‘ভিত্তিহীন খবর’ বলল আবুধাবি

যুদ্ধ বন্ধে ‘চুক্তির এত কাছাকাছি আর কখনোই আসেনি’ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, কী আছে এতে

চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন মোজতবা—দাবি ট্রাম্পের, ইরান বলছে ‘না’

ওমান সাগরে এবার হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তেল ট্যাংকার বিকল করল মার্কিন বাহিনী