ইসরায়েল ঈদুল ফিতর এবং তার পরেও আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করেছে। এমনটি জানিয়েছে লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই। অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের এই মসজিদ-সংক্রান্ত বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ইসলামিক ওয়াক্ফকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। ওয়াক্ফ হলো ওই পবিত্র স্থানের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সংস্থা।
ইসলাম ধর্মের অন্যতম পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদ চলতি মাসের শুরুতেই ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি’কে কারণ হিসেবে দেখানো হয়। বিশেষ করে রমজান মাসে এই নজিরবিহীন বন্ধের সিদ্ধান্তকে ফিলিস্তিনিরা নিন্দা জানিয়ে বলেছে, নিরাপত্তা উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে আল-আকসার ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ ও বিধিনিষেধ জোরদারের চেষ্টা এটি।
ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম কোনো রমজানে ফিলিস্তিনিরা মসজিদটিতে জুমার নামাজ আদায় করতে পারেননি। গত সপ্তাহে আটটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এই ‘অযৌক্তিক’ বন্ধের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, পবিত্র এই স্থানের ওপর ইসরায়েলের ‘কোনো সার্বভৌমত্ব নেই’ এবং অবিলম্বে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে।
তবে তাতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। জুমার নামাজ ও রমজানের রাতের নামাজ এখনো নিষিদ্ধ। পুরোনো শহর এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর কঠোর উপস্থিতির মধ্যে ফিলিস্তিনিদের সেখানে পৌঁছাতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। বন্ধের পর থেকে বিশাল এই মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রতি শিফটে ওয়াক্ফের সর্বোচ্চ ২৫ জন কর্মীকে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, পাণ্ডুলিপি বিভাগ থেকে অতিরিক্ত একজন কর্মী প্রবেশের অনুরোধও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসরায়েলি পুলিশ নাকি ওয়াক্ফকে জানিয়েছে, যদি অতিরিক্ত কোনো কর্মীকে ঢুকতে দেওয়া হয়, তাহলে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের আবার মসজিদে প্রতিদিন অনুপ্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ওয়াক্ফ কর্মকর্তাদের সন্দেহ আল-আকসা মসজিদের ভেতরের নামাজের হলগুলোতে, এমনকি ডোম অব দ্য রকসহ বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি বাহিনী গোপনে ক্যামেরা স্থাপন করেছে, যাতে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো যায়।
মসজিদ বন্ধের পাশাপাশি পুরোনো শহর এলাকাও প্রায় পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এখানেই আল-আকসা মসজিদ এবং সাধারণত প্রাণচঞ্চল বহু ফিলিস্তিনি পরিচালিত বাজার অবস্থিত। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শুধু পুরোনো শহরের বাসিন্দাদেরই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এলাকা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে।
অথচ প্রাচীন দেয়ালের ঠিক বাইরে কয়েক মিটার দূরেই জীবন স্বাভাবিকভাবে চলছে। গত রোববার ছিল ইসলামি ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে পবিত্র রাত লাইলাতুল কদর। ওই রাতে ইসরায়েল শত শত পুলিশ মোতায়েন করে মসজিদের পথগুলো বন্ধ করে দেয়। ফলে সহিংসতার আশঙ্কার মধ্যে মুসল্লিরা রাস্তায় নামাজ আদায় করতে বাধ্য হন।
জেরুজালেমে ইসলামিক ওয়াক্ফ কাউন্সিলের সদস্য ও আল-আকসা মসজিদের শিক্ষক অধ্যাপক মুস্তাফা আবু স্বাবী বলেন, ‘এভাবে পুরোনো শহর বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।’ তিনি বলেন, ‘পুরোনো শহরের ভেতরে যা ঘটছে এবং বাইরে যা ঘটছে, তার মধ্যে বড় অসামঞ্জস্য রয়েছে। বাইরে মানুষ স্বাধীনভাবে চলাফেরা করছে, মসজিদে নামাজ পড়ছে, শহরের জীবন স্বাভাবিক আছে।’
আবু স্বাবী আরও বলেন, যদি সত্যিই মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকত, তাহলে আল-আকসার নিচের নামাজের হলগুলোতে আশ্রয় নেওয়া যেত, যেখানে হাজার হাজার মানুষ অবস্থান করতে পারে। ইসলামিক ওয়াক্ফের আন্তর্জাতিক বিষয়ক পরিচালক আওনি বাজবাজ চলতি মাসের শুরুতে বলেন, এই বন্ধ দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ‘যা আপাতত সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা ধীরে ধীরে স্থায়ী বা আধা স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে মানুষ যদি এই সীমাবদ্ধতার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায় বা প্রবেশের ধরনে পরিবর্তন ঘটে।’ দশকের পর দশক ধরে একটি ‘স্ট্যাটাস কো’ বা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আওতায় আল-আকসা মসজিদ পরিচালিত হয়ে আসছে, যা এটিকে একান্তভাবে ইসলামি ধর্মীয় স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করে। এই ব্যবস্থার অধীনে মসজিদের প্রশাসন ও প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব জেরুজালেমের ইসলামিক ওয়াক্ফের ওপর ন্যস্ত, যা জর্ডানের নিয়োগপ্রাপ্ত ধর্মীয় ট্রাস্ট সংস্থা।
তবে ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, মুসলিমদের প্রবেশে ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে এবং ইহুদি উপস্থিতি ও ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে এই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয় করা হয়েছে। পূর্ব জেরুজালেম, যার মধ্যে পুরোনো শহরও রয়েছে, সেখানে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন নীতির লঙ্ঘন। এসব নীতিতে বলা হয়েছে, কোনো দখলদার শক্তির দখলকৃত ভূখণ্ডের ওপর সার্বভৌমত্ব থাকে না এবং সেখানে স্থায়ী পরিবর্তন আনার অধিকারও নেই।