গাজার চলমান যুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে যে বৈশ্বিক প্রচারণাযন্ত্র গড়ে তুলেছিল ইসরায়েল, তা আইনি চাপের মুখে পড়েছে। প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার, যোগাযোগ পরামর্শক এবং মিডিয়া কোম্পানিগুলো সরকারের বিরুদ্ধে মিলিয়ন মিলিয়ন শেকেলের মামলা করেছে। অভিযোগ, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার সময় আন্তর্জাতিক বার্তা প্রচারের জন্য তারা যে কাজ করেছিল, তার জন্য সরকার প্রতিশ্রুত অর্থ পরিশোধ করেনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে ইসরায়েলি দৈনিক ক্যালকালিস্ট। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অনেকেই জানিয়েছেন, যুদ্ধের চূড়ান্ত উত্তেজনাপূর্ণ সময় তাঁদের জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বিদেশে ইসরায়েলপন্থী ন্যারেটিভ ছড়িয়ে দিতে। পরে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়নি।
পরে তদন্তে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ভেতরে গুরুতর অনিয়মের তথ্যও সামনে আসে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সংঘটিত অপারেশন আল-আকসা ফ্লাডের পর তথ্য মন্ত্রণালয় ভেঙে পড়লে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক বার্তা প্রচারের দায়িত্ব নেয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। সেই সময় সরকারি কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক টেন্ডারের প্রক্রিয়া এড়িয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবর্তে তাঁরা বেসরকারি প্রোডাকশন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগুলো সম্প্রসারণ করেন। এসব প্রতিষ্ঠানকে পরে বিদেশে কাজ করা ইসরায়েলপন্থী ভাষ্যকার ও পরামর্শকদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এখন সেই কোম্পানিগুলোর কয়েকটি বলছে, রাষ্ট্র তাদের পাওনা পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান ইন্টেলেক্ট প্রোডাক্ট অ্যান্ড পাবলিশিং গ্রুপ প্রায় ১৭ লাখ শেকেল (প্রায় ৫ লাখ ৫২ হাজার ডলার) আদায়ের দাবিতে মামলা করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে শুনানির সময় ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভের মোকাবিলায় মিডিয়া কার্যক্রম ও ভ্রমণ ব্যয়ের অর্থ বহন করেছিল। এই শুনানিগুলো হয়েছিল আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে।
ইসরায়েলি সরকারের সাবেক মুখপাত্র এইলন লেভিও ভুক্তভোগীদের একজন। তিনি দাবি করেছেন যে আন্তর্জাতিক প্রচারণা কার্যক্রমে কাজ করার পরও সরকার এখনো তাঁর পাওনা অর্থ পরিশোধ করেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেভির মাসিক পারিশ্রমিক ছিল ৪১ হাজার ১২৫ শেকেল (১৩ হাজার ডলারের কিছু বেশি)। তবে এই অর্থ সরাসরি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে না দিয়ে ইন্টেলেক্ট প্রোডাক্ট অ্যান্ড পাবলিশিং গ্রুপের মাধ্যমে তাঁকে দেওয়া হতো।
আরেকটি প্রতিষ্ঠান স্পিডি কল জানিয়েছে, তারা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যবহার করেন, এমন সামরিক সদর দপ্তর কিরয়ার ভেতরে ২৪ ঘণ্টা চালু একটি সাক্ষাৎকার স্টুডিও স্থাপন করেছিল। এই কোম্পানির দাবি, ৯ মাসের কাজের জন্য ৬ লাখ শেকেলের (প্রায় ২ লাখ ডলার) বেশি অর্থ এখন পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে ইসরায়েল সরকার।
ইসরায়েলের এই প্রচারণা কাঠামোর ভেতরে অর্থ পরিশোধ-সংক্রান্ত বিরোধ যখন প্রকাশ্যে আসছে, তখন একই সঙ্গে গাজা যুদ্ধ চলাকালে তেল আবিবের বৈশ্বিক প্রচারণা কার্যক্রমের ব্যাপকতা সম্পর্কেও নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। বিভিন্ন তদন্ত ও প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, ইসরায়েল-সংযুক্ত জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রতি পোস্টের জন্য হাজার হাজার ডলার করে অর্থ দিয়েছে, যাতে তারা অনলাইনে ইসরায়েলপন্থী বয়ান প্রচার করে।
মার্কিন আইনের অধীনে জমা দেওয়া নথি, বিশেষ করে ফরেইন রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের আওতায় প্রকাশিত দলিলে দেখা যায়, তথাকথিত ‘এসথার প্রজেক্ট’ নামের একটি প্রচারণা কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতি পোস্টে গড়ে প্রায় ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত অর্থ দেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে জনমতকে ইসরায়েলের পক্ষে প্রভাবিত করা এবং এর বিরোধীদের নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা।
এর আগেও ইসরায়েল গাজায় সুপরিকল্পিত ইনফ্লুয়েন্সার সফরের আয়োজন করেছে। এসব সফরে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গাজার অভ্যন্তরে ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখানো হয়। কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করত গাজা হিউম্যানিটারিয়া ফাউন্ডেশন। যেটিকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ ত্রাণ প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং যা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। এই সফরের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গাজায় দুর্ভিক্ষের খবরের পাল্টা বর্ণনা তুলে ধরা।
এসব সফরকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেন ইসরায়েল মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে সহায়তা করছে। অথচ জাতিসংঘসহ বহু সংস্থার বিস্তৃত নথিপত্রে দেখা গেছে, গাজায় দেখা দেওয়া দুর্ভিক্ষ মূলত মানবিক সহায়তার ওপর ইসরায়েলের পদ্ধতিগত বিধিনিষেধ এবং ত্রাণ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করার সরাসরি ফল।
এসব উদ্যোগকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা যুদ্ধের ‘অষ্টম ফ্রন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটি এমন এক সমান্তরাল লড়াই, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি বয়ান ও ধারণার লড়াইও চলছে। এই লড়াই পরিচালিত হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, বিজ্ঞাপন নেটওয়ার্ক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ডিজিটাল প্রচারণার মাধ্যমে, যার লক্ষ্য গাজা যুদ্ধ নিয়ে বৈশ্বিক জনমতকে প্রভাবিত করা।
তথ্যসূত্র: দ্য ক্রেডল