ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপাল অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে (এইমস) চিকিৎসকদের চরম অবহেলায় তিন বছরের এক ক্যানসার আক্রান্ত শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধের পরিবর্তে ভুলবশত শিশুটির শরীরে ‘ফরমালিন’ ইনজেকশন দেওয়ার কারণে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর এই রাসায়নিকটি সাধারণত ল্যাবরেটরিতে মরদেহ বা বায়োপসির নমুনা সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর অভিযুক্ত দুই নার্সের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছে পুলিশ।
সার্থক যাদব নামের ওই শিশু সাগর জেলার বীণা তহসিলের কৌর্জা গ্রামের বাসিন্দা ছিল। রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত সার্থককে গুরুতর অবস্থায় গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ভোপাল ওই হাসপাতালের শিশু বিভাগে ভর্তি করা হয়েছিল।
সার্থকের পরিবারের অভিযোগ, ১৭ ডিসেম্বর সকালে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। শিশুটির স্যালাইনের লাইন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে সময় কর্তব্যরত নার্সিং অফিসার ওয়ার্ডে পড়ে থাকা ‘F’ চিহ্নিত একটি সিরিঞ্জ তুলে নেন এবং কোনো ধরনের পরীক্ষা না করেই সিরিঞ্জের ভেতরের তরল সার্থকের স্যালাইনের বোতলে পুশ করেন।
সার্থকের বাবা সিদ্ধার্থ যাদব বলেন, ‘আমার ছেলের ক্যানসার ছিল, তাই আমরা তাকে এইমসে ভর্তি করি। সকালে এক নার্স এসে দেখেন স্যালাইনের লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি টেবিল থেকে ‘F’ লেখা একটি সিরিঞ্জ নিয়ে স্যালাইনের বোতলে ইনজেকশন দিয়ে দেন। আমি তাঁকে তিনবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বলেন, “এখানে ডাক্তার আপনি নাকি আমি” এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার ছেলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই সার্থকের অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তাকে দ্রুত পিআইসিইউতে (শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নিয়ে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস (সিপিআর) দেওয়া হলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে শিশুটির মৃত্যু হয়।
সিদ্ধার্থের অভিযোগ, শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতালের কর্মীরা প্রমাণ লোপাটের জন্য স্যালাইনের বোতলটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
ভোপাল এইমসের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে, সার্থকের মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কারণ ছিল শরীরে সরাসরি ফরমালিন প্রবেশ করা। তদন্তে নার্সিং স্টাফদের চরম গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি বায়োপসি নমুনার জন্য সিরিঞ্জে ফরমালিন তুলে রাখা হয়েছিল, যা অসাবধানতাবশত ওয়ার্ডের ভেতর অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়।
অভিযুক্ত নার্সিং অফিসার মধুবালা শর্মার বিরুদ্ধে শিশুটির শরীরে ওই রাসায়নিক পুশ করার এবং অপর নার্সিং অফিসার অনুকা গুজরাটির বিরুদ্ধে বিপজ্জনক রাসায়নিকটি নিরাপদ স্থানে না রেখে অবহেলা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
হাসপাতালের তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় বাগসেওয়ানিয়া থানা-পুলিশ অভিযুক্ত দুই নার্সের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
ফরমালিন হলো মূলত ফরমালডিহাইড গ্যাসের জলীয় দ্রবণ। এটি অত্যন্ত তীব্র ও বিষাক্ত রাসায়নিক। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবং পরীক্ষাগারে মানবদেহের বিভিন্ন টিস্যু, বায়োপসির নমুনা কিংবা অ্যানাটমি বিভাগের মরদেহ পচন থেকে রক্ষা করতে এটি প্রিজারভেটিভ বা পচনরোধী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সরাসরি মানবদেহের রক্তে বা শিরায় এটি প্রবেশ করলে তা মুহূর্তের মধ্যে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।