বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত চার হাজার কিলোমিটারের বেশি। দীর্ঘ এই সীমান্ত পথে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) প্রায়ই গুলি চালায়। এ নিয়ে দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হলেও গুলি চালানো বন্ধ হয়নি। সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ড্রোন নজরদারি, জিপিএস-সমর্থিত ট্র্যাকিং ও লোকেটিং গ্যাজেট এবং থার্মাল ইমেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিএসএফ। এ ছাড়া কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের স্থলসীমান্তের কিছু অংশ করা হয়েছে বিদ্যুতায়িত।
এবার বাংলাদেশ সীমান্তের নদীপথের অংশে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে বিএসএফ। এরই অংশ হিসেবে যান্ত্রিক নজরদারির পাশাপাশি সীমান্তে বিষধর সাপ ও কুমিরের মতো হিংস্র সরীসৃপ প্রাণী ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করছে তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ফেডারেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিএসএফের উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে এ বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিন বিএসএফের প্রধান প্রবীণ কুমারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর ২০ মার্চ বিএসএফের নয়াদিল্লি সদর দপ্তরে শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের আরেকটি বৈঠকে বিষয়টি ওঠে। এরপর মাঠপর্যায়ের সিনিয়র কর্মকর্তাদের কাছে বার্তা পাঠানো হয়।
২০ মার্চের বৈঠকে সাপ ও কুমির ব্যবহারের প্রস্তাব ছাড়াও বিএসএফের পূর্ব অঞ্চলের সেক্টর হেডকোয়ার্টার্সগুলোকে মোবাইল নেটওয়ার্ক সংযোগহীন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের সীমান্ত আউটপোস্টগুলো চিহ্নিত করা এবং ম্যাপ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্তসংলগ্ন গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে করা মামলার পরিসংখ্যানও তলব করেছে বিএসএফ সদর দপ্তর।
দ্য ফেডারেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি বিএসএফের একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে এই অভিনব পদ্ধতির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ২০ মার্চ নয়াদিল্লিতে বিএসএফ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের আরেকটি বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বিএসএফ-প্রধানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকের পর মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে লিখিত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
কেন এই পরিকল্পনা
৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অনেক জায়গায় নদী ও জলাভূমি থাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। এসব ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ও অরক্ষিত এলাকা দিয়ে অবৈধ চলাচল এবং চোরাচালান বন্ধ করা বিএসএফের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিএসএফ মনে করছে, ড্রোন, জিপিএস ট্র্যাকিং বা থার্মাল ইমেজারের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি এসব জলপথে সাপ ও কুমির থাকলে তা অনুপ্রবেশকারীদের জন্য বড় আতঙ্ক হিসেবে কাজ করবে।
বিতর্ক ও সমালোচনা
সীমান্তে বিএসএফের গুলি চালানো নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিনের সমালোচনা রয়েছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সীমান্তে মানুষ হত্যার বিকল্প হিসেবে এই ‘প্রাণঘাতী প্রাণী’ ব্যবহারের পরিকল্পনাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অমানবিক হতে পারে। সীমান্তের সাধারণ গ্রামবাসী, যারা দৈনন্দিন প্রয়োজনে বা মাছ ধরতে জলাভূমিতে নামে, তাদের জীবনও এতে চরম হুমকিতে পড়বে।
বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত চিঠিতে দেখা গেছে, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সমস্ত সেক্টর হেডকোয়ার্টার্সকে সীমান্তের ফাঁকা জায়গাগুলোতে সরীসৃপ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলা হয়েছে। তবে সাপ ও কুমির ধরার দায়িত্ব কারা পালন করবে, ঠিক কী পরিমাণ প্রাণীর প্রয়োজন হবে এবং সীমান্তের কোন কোন নির্দিষ্ট পয়েন্টে এগুলো ছাড়া হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো রূপরেখা তৈরি হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের পরিপন্থী কি না এবং এর পরিবেশগত প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।