যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারেন—এমন আশঙ্কায় দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের রানওয়ে উড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছিলেন ডেনিশ সেনারা। গত জানুয়ারিতে সেখানে তাঁদের পাঠানো হয়। এমনটাই জানিয়েছে ডেনমার্কের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ডিআর।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ডেনিশ সরকার, সামরিক বাহিনী এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সূত্র উদ্ধৃত করে ডিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংঘর্ষ শুরু হলে আহতদের চিকিৎসার জন্য রক্তের মজুতও নেওয়া হয়েছিল। আরেক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, ইউরোপের দুই কর্মকর্তা এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিবিসিকে জানিয়েছে, এ বিষয়ে তাদের ‘কোনো মন্তব্য নেই’।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডেনিশ সেনাবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, নিরাপত্তার কারণে ‘খুব সীমিতসংখ্যক মানুষই এই অভিযানের বিষয়ে জানতেন’।
যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক উভয়ই ন্যাটোর সদস্য। কিন্তু ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড নিয়ে বিরোধ ওয়াশিংটন ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে গভীর বিভাজন তৈরি করেছে। ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে বারবার গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে গ্রিনল্যান্ডের নেতা ও ডেনমার্ক বারবার দ্বীপটি কেনার বা অধিগ্রহণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ডিআর জানায়, তারা ডেনিশ সরকার ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের ১২টি সূত্রের পাশাপাশি ফ্রান্স, জার্মানিসহ মিত্র দেশগুলোর সূত্রের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এসব সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের চাপ মোকাবিলায় কোপেনহেগেন প্যারিস, বার্লিনসহ নর্ডিক দেশগুলোর কাছে রাজনৈতিক সমর্থন চেয়েছিল। ইউরোপীয় সংহতি প্রদর্শন এবং গ্রিনল্যান্ডে আরও যৌথ সামরিক কার্যক্রম চালানোর মাধ্যমে ট্রাম্পকে মোকাবিলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
তবে ৩ জানুয়ারি পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ওই দিন মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক আকস্মিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে। এর পরদিন ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি ‘দুই মাসের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ভাববেন’ এবং দাবি করেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। এটি অত্যন্ত কৌশলগত।’ কোনো প্রমাণ না দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এখন গ্রিনল্যান্ডজুড়ে রুশ ও চীনা জাহাজ ছড়িয়ে আছে।’
ডেনিশ নিরাপত্তা সংস্থার এক উচ্চপদস্থ সূত্র ডিআরকে বলেন, ‘ট্রাম্প যখন বারবার বলেন তিনি গ্রিনল্যান্ড দখল করতে চান, আর ভেনেজুয়েলায় যা ঘটল তা ঘটল, তখন আমাদের সব সম্ভাবনাকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়েছে।’ এক ইউরোপীয় কর্মকর্তা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘ভেনেজুয়েলার পর তারা (আমেরিকানরা) মনে করেছিল তারা সবকিছুই করতে পারে। চলুন এটা দখল করি, ওই দেশটাও দখল করি।’
এর কিছুদিন পর ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে ও সুইডেনের ছোট একটি যৌথ সামরিক দল গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক এবং বিমানবন্দর থাকা এলাকা কাংগারলুসুয়াকে পাঠানো হয়। সে সময় ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, প্রাথমিক এই বাহিনীকে স্থল, আকাশ ও নৌ শক্তি দিয়ে আরও জোরদার করা হবে।
ডেনিশ সংবাদমাধ্যম আরও জানায়, পরবর্তী পর্যায়ে শীতল ও দুর্গম পার্বত্য এলাকায় যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত ডেনিশ বিশেষ বাহিনী এবং ফরাসি সেনাদলও পাঠানো হয়। ডেনিশ যুদ্ধবিমান ও একটি ফরাসি নৌজাহাজ উত্তর আটলান্টিকের দিকে মোতায়েন করা হয়। এই মোতায়েনকে প্রকাশ্যে ‘অপারেশন আর্কটিক এন্ডিউরেন্স’ নামের ডেনমার্ক নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক মহড়া হিসেবে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে ডেনিশ সেনারা প্রতিরোধ করবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি নুক ও কাংগারলুসুয়াকের রানওয়ে উড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতিও ছিল, যাতে মার্কিন সামরিক বিমান সেখানে অবতরণ করতে না পারে। ডেনিশ প্রতিরক্ষা সূত্রের ভাষ্য, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয় বাড়াতে হতো। গ্রিনল্যান্ড পেতে হলে তাদের শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে হতো।’ যদিও তিনি স্বীকার করেন, মার্কিন হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হতো না বলেই ধারণা ছিল।
এরপর, ২১ জানুয়ারি ট্রাম্প—যিনি এর আগে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি—দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বলেন, ‘আমি বলপ্রয়োগ করতে চাই না। করবও না। যুক্তরাষ্ট্র শুধু গ্রিনল্যান্ড নামের একটি জায়গা চায়।’ এরপর তিনি ‘তাৎক্ষণিক আলোচনার’ মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন বলে জানান, যাতে উত্তেজনা কমানো যায়।