আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের কারখানার শ্রমিক-কর্মকর্তাদের বেতন-বোনাস দিতে কারখানামালিকেরা নগদ সহায়তা ও এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে পাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় এই উদ্যোগ নিয়েছে। এরই মধ্যে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার শ্রমিকদের এক মাসের বেতনের জন্য বিশেষ ঋণসুবিধা চালু করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংকগুলো এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ঋণ দিতে পারবে।
এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে রপ্তানির বিপরীতে বকেয়া থাকা নগদ সহায়তার ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়েও একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রণালয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ আজ মঙ্গলবার সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের স্ব স্ব লিয়েন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ছয়-সাত মাস ধরে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি চলছে। দেশে নানা সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কারখানামালিকেরা সংকটের মধ্যে রয়েছেন। তার ওপর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সংকট আরও বেড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এলএনজির অভাবে পণ্য রপ্তানি ব্যাহত হবে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে রপ্তানির খরচ অনেক বেড়ে যাবে। সব মিলিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের এবারের বেতন-বোনাস দেওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে। প্রণোদনা ও ঋণের অর্থ দ্রুত ছাড় পেলে ঈদের বেতন-বোনাসের অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা ব্যাংকগুলোর প্রতি ঋণের ক্ষেত্রে প্রকৃত সমস্যাগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিজিএমইএসহ তৈরি পোশাক খাতের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের সমস্যাগুলো জানান। এ সময় তাঁরা বকেয়া নগদ প্রণোদনা দ্রুত ছাড় ও পদ্ধতি সহজীকরণ, ঋণ পুনঃ তফসিলীকরণ ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল জোগান দেওয়া এবং ঈদে বেতন-বোনাস দিতে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়াসহ বেশ কিছু দাবি জানান।
এই দাবি নিয়ে তার আগে ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গেও দেখা করেন। ওই সময় তাঁরা বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বস্ত্র ও পোশাক খাতে এখনো প্রায় ৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রণোদনা অনিষ্পন্ন থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র অর্থসংকটে রয়েছে, যা রপ্তানি সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বকেয়া নগদ সহায়তার অর্থ দ্রুত ছাড় করার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও গতিশীল করার দাবি জানান তাঁরা।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদুল হাসান খান বাবু আজকের পত্রিকাকে বলেন, পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বোনাস ও বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল পরিশোধ নিয়ে পোশাকশিল্পের মালিকেরা প্রবল চাপে রয়েছেন। এই অর্থ বরাদ্দ শিল্পমালিকদের জন্য বড় স্বস্তি।
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) নতুন সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘প্রণোদনা ও ঋণসুবিধায় যে অর্থ আমরা পাব, তা দিয়ে এবারের ঈদের বেতন-বোনাস হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত কেটে গেল। কিন্তু ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সামনের দিনগুলোয় কী হবে, সে ক্ষেত্রে একটা অনিশ্চয়তা রয়ে গেল।’ এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর প্রতি সমতা বজায় রাখার দাবি জানান তিনি।
বিশেষ ঋণসুবিধা চালু
রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার মালিকদের অনুরোধে শ্রমিকদের এক মাসের বেতনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আজ এক প্রজ্ঞাপনে বিশেষ ঋণসুবিধা চালু করেছে। প্রজ্ঞাপনে ব্যাংকগুলোকে এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ ঋণ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই ঋণের অর্থ সরাসরি শ্রমিকদের ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পাঠাতে হবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সচল ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন–ভাতা পরিশোধের জন্য কারখানামালিকেরা এই সুবিধা পাবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়িক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি ধারাবাহিক নিম্নমুখী রপ্তানি, ক্রয়াদেশ পিছিয়ে যাওয়া, তারল্য-সংকটসহ বিভিন্ন কারণে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের সক্ষমতা কমছে। এ জন্য উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রেখে রপ্তানির ধারা অব্যাহত রাখার জন্য রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুসারে, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান মোট উৎপাদনের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ রপ্তানি করে, তারা রপ্তানিমুখী শিল্প এবং যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের শ্রমিক-কর্মচারীদের ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত বেতন পরিশোধ করেছে, তারা সচল হিসেবে বিবেচিত হবে।
ঋণ দেওয়ার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনায় বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারির বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য চলতি মূলধন ঋণসীমার বাইরে প্রয়োজন অনুসারে এবং গ্রাহকের সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে মেয়াদি ঋণসুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এই ঋণসুবিধার পরিমাণ ঋণগ্রহীতা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিগত তিন মাসের প্রদত্ত গড় বেতন-ভাতার বেশি হবে না। এসব ঋণের বিপরীতে বাজারভিত্তিক প্রচলিত সুদহার প্রযোজ্য হবে। ঋণের অর্থ মেয়াদি ঋণ আকারে তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ এক বছরে সমান কিস্তিতে (মাসিক বা ত্রৈমাসিক) আদায় করতে হবে। এই ঋণের ওপর নিয়মিত সুদ ছাড়া অন্য কোনো প্রকার অতিরিক্ত ফি বা চার্জ আরোপ করা যাবে না।
নগদ সহায়তার অর্থ বরাদ্দ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় কিস্তির প্রথম ধাপে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও দ্বিতীয় ধাপে ১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে। অর্থাৎ দুই ধাপে মোট ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএ তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বকেয়া অর্থ প্রাপ্তির লক্ষ্যে নিজ নিজ লিয়েন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।