হোম > সারা দেশ > মানিকগঞ্জ

পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ঘাটে ভয় আর দুশ্চিন্তাই নিত্যসঙ্গী

আব্দুর রাজ্জাক, (ঘিওর) মানিকগঞ্জ

ছবি: আজকের পত্রিকা

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুট এখন যাত্রী ও চালকদের জন্য এক আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। গত বুধবারের দৌলতদিয়া ঘাটে বাসডুবির ভয়াবহ ঘটনা এই নৌ-রুটের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, ঘাটের পকেট ও সংযোগ সড়কগুলোতে কোনো কার্যকর গাইড ওয়াল বা রেলিং না থাকায় এবং রাস্তা অতিরিক্ত ঢালু ও এবড়োখেবড়ো হওয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই নৌ-রুটে বড় বাসের চাপ কিছুটা কমলেও ঈদসহ বড় ছুটিতে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। এ ছাড়া পণ্যবাহী ট্রাক, ছোট যানবাহন এবং আঞ্চলিক রুটের শত শত বাসের জন্য এই রুট এখনো অপরিহার্য। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ২১টি জেলার কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন এই নৌ-রুট ব্যবহার করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই রুটে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৮টি ফেরি চলাচল করছে। কাগজ-কলমে পাটুরিয়া প্রান্তে ৫টি এবং দৌলতদিয়া প্রান্তে ৭টি ঘাট থাকলেও বাস্তবে সচল ও কার্যকর রয়েছে অর্ধেক ঘাট। বাকিগুলো অধিকাংশ সময় পলি জমা বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অকেজো পড়ে থাকে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, দুই প্রান্তের ১০-১২টি পন্টুন এবং সেগুলোর সংযোগ সড়কের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। বিশেষ করে দৌলতদিয়া ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ঘাটের পন্টুনগুলো নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে ওঠানামা করায় সংযোগ পথের ঢাল অনেক সময় খাড়া হয়ে যায়। বর্তমানে এই ঢাল প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, ফেরিঘাটের সংযোগ সড়কের ঢাল সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রির মধ্যে থাকা উচিত। অতিরিক্ত ঢালু হওয়ার কারণে বৃষ্টি, বর্ষা বা কুয়াশার সময় ভারী যানবাহনগুলো ব্রেক ধরে রাখতে পারে না, ফলে চাকা পিছলে সরাসরি নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।

নিরাপত্তাবেষ্টনীর অভাব এই নৌরুটের সবচেয়ে বড় সংকট। অধিকাংশ পন্টুনে কোনো গাইড ওয়াল বা রেলিং নেই। যেখানে নামমাত্র রেলিং আছে, সেগুলোর উচ্চতা মাত্র ১.৫ থেকে ২ ফুট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ৪-৫ টন ওজনের চলন্ত যানবাহনের গতি রোধ করতে কমপক্ষে ৪ থেকে ৬ ফুট উঁচু আরসিসি গাইড ওয়াল অথবা শক্তিশালী স্টিলের গার্ড রেল থাকা বাধ্যতামূলক। বর্তমানের নড়বড়ে রেলিংগুলো বড় কোনো ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা রাখে না, যা গত কয়েক বছরের দুর্ঘটনাগুলোতে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। মেহেরপুর থেকে ঢাকাগামী জেআর পরিবহনের সুপারভাইজার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পন্টুনে কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী বা রেলিং নেই; থাকলে ওই বাসটি নদীতে পড়ত না।’

বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন জানান, ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্টে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীসহ অন্য কর্মীরা নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বুধবার দুর্ঘটনার আগে বাসটি ফেরিঘাটে অপেক্ষমাণ ছিল। বাসটি ব্রেক ফেল করলে চালক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। পানির স্তরের অস্বাভাবিক ওঠানামার কারণে রাস্তা মাঝে মাঝে বেশি ঢালু হয়ে যায় এবং প্রতিনিয়ত রুট পরিবর্তন করা হয়। তাঁর দাবি, প্রকৌশল বিভাগকে দ্রুত গাইড ওয়াল এবং রেলিং স্থাপনের জন্য জানানো হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিসি এবং ঘাটসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই নৌরুটে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ যানবাহন পারাপার হয়। এর মধ্যে বড় ও মাঝারি ট্রাকের সংখ্যাই প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০। এ ছাড়া প্রতিদিন গড়ে ৮০০ থেকে ১ হাজার বাস এবং প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ ছোট প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস এই রুটের ফেরি ব্যবহার করে।

দূরপাল্লার বাসচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ঘাটের পকেটে গাড়ি নামানোর সময় তাঁদের জীবন হাতে নিয়ে স্টিয়ারিং ধরতে হয়। বিশেষ করে খাঁড়া ঢালে ব্রেক ফেল করলে গাড়িকে আটকানোর মতো কোনো বাধা বা গাইড ওয়াল নেই, রাস্তার দুই পাশেও নেই কোনো বেষ্টনী। গত কয়েক দিনের দুর্ঘটনার পর থেকে চালকেরা চরম আতঙ্কে গাড়ি চালাচ্ছেন।

এই রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী রাজবাড়ীর বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী তানিয়া সুলতানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাস যখন ওই সরু আর ঢালু রাস্তা দিয়ে নামে, তখন জানালার বাইরে তাকালে শুধু পানি দেখি। কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই, ভাবতেই অবাক লাগে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘাটের এই দশা!’

বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ জানান, ভবিষ্যতে দুর্ঘটনা রোধে ফেরিতে ওঠার আগেই বাস থেকে সব যাত্রীকে নামাতে হবে, প্রতিটি পন্টুনে শক্ত রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে এবং ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের আধুনিক ও উন্নত মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

ঘাট পরিদর্শনে তদন্ত কমিটি

এদিকে বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, গতকাল রোববার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাট পরিদর্শন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি। গত বুধবার কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী ‘সৌহার্দ্য পরিবহনের’ একটি যাত্রীবাহী বাস ওই ঘাট দিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এতে ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।

গতকাল সকালে তদন্ত কমিটির সদস্যরা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। কমিটির আহ্বায়ক ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিদুল ইসলাম পরিদর্শনের সময় বলেন, ‘এটি একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেব। আমাদেরও সুপারিশ থাকবে যেন এমন দুর্ঘটনা এড়িয়ে চলা যায়।’

ঘিওরে অটোরিকশাচালককে হত্যাকারী তিন বন্ধুর ফাঁসির দাবি

সেই অটোচালকের মাথা মিলল দুই কিমি দূরে

ঢাকায় ফিরতে বাড়তি ভাড়া, বিপাকে যাত্রীরা

মানিকগঞ্জে মস্তকবিহীন লাশ অটোচালক রফিকের, গ্রেপ্তার ৩

এবার পাটুরিয়ায় ফেরিতে আগুন

কালীগঙ্গা নদী থেকে যুবকের মাথাবিচ্ছিন্ন লাশ উদ্ধার

মানিকগঞ্জে ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমানোর দাবিতে কিষানিদের মানববন্ধন

রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় ডাকাতি, কোটি টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ

পাটুরিয়া–দৌলতদিয়া ঘাটে নৌযান চলাচল শুরু

পাটুরিয়া-আরিচা ঘাটে যাত্রীর চাপ বাড়লেও ভোগান্তি নেই