ফরিদপুর সদর উপজেলায় ১৭টি বসতঘরে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। এমনকি মসজিদের ভেতরে আশ্রয় নেওয়া তিনজনকে পিটিয়ে আহত করা হয়। স্থানীয় এক ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে এই হামলা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে আটক করেছে।
জানা গেছে, ফরিদপুর সদরের কানাইপুর ইউনিয়নের মধ্য কাশিমাবাদ গ্রামে ঈদের নামাজের সময় নির্ধারণ ও মসজিদের ইমামের বেতন বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে গতকাল শনিবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত তিনজন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আজ রোববার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, হামলার শিকার ১৭টি বসতঘরের বেড়া, দরজাসহ বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিটি ঘরের টিনের বেড়া ভাঙচুর রয়েছে, বেশির ভাগ ঘরের জানালার থাই গ্লাস ভেঙে চুরমার করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঘরের ভেতরে থাকা টিভি, ফ্রিজ, আলমারিসহ সব আসবাব ভাঙচুরের দৃশ্য দেখা যায়। পাশাপাশি মসজিদেও হামলা চালিয়ে মাইক, পানির ট্যাংক ও জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া মসজিদটির দ্বিতীয় তলার ছাদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় নিক্ষেপের অসংখ্য ইটের টুকরো, এমনকি রক্তের ছোপ ছোপ দাগ।
কাশিমাবাদ মধ্যপাড়া জামে মসজিদ কমিটি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অভিযোগ, কোতোয়ালি থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও পার্শ্ববর্তী রামখণ্ড গ্রামের বাসিন্দা সোহেল মুন্সি (৩৬), কার্যক্রম নিষিদ্ধ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রফিকুল আলম খান (৪৬), ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুন খানের (৫৮) নেতৃত্বে দুই শতাধিক লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতর্কিতভাবে এ হামলা চালিয়েছে।
এ সময় হামলাকারীরা মসজিদের আশপাশের ১৭টি বাড়িতে রামদা, চাপাতি, চাইনিজ কুড়ালসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভীতি সঞ্চার করে ভাঙচুর ও ঘরে থাকা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা সহ মূল্যবান আসবাব লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রায় কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত ও লুট হয়েছে বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন।
জানা গেছে, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় কাশিমাবাদ মধ্যপাড়া জামে মসজিদে কমিটির উদ্যোগে আলোচনার মাধ্যমে ঈদের জামায়াতের সময়সূচি সকাল ৮টায় নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া মসজিদের ইমামের বেতন দুই হাজার টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মসজিদ কমিটির এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বাধা দেন রফিকুল আলম খান (৪৬) এবং হারুন খান (৫৮)। একপর্যায়ে তাঁদের সঙ্গে মসজিদ কমিটিসহ স্থানীয়দের বাগ্বিতণ্ডা হয়। এ ঘটনার জেরে পর দিন ঈদের নামাজের শেষে আবারও তাঁরা বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।
এ সময় উত্তেজনা সৃষ্টি হলে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করলেও বেলা দেড়টার দিকে ছাত্রদল নেতা সোহেল মুন্সির নেতৃত্বে রফিকুল আলম খান ও হারুন খান দুই শতাধিক লোক নিয়ে অতর্কিতভাবে হামলা চালায়। তাঁরা প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালান।
ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ কমিটির হিসাবরক্ষক আকতার হোসেন বলেন, ‘ঈদের আগের দিন রাতে এশার নামাজের সময় সবাইকে নিয়ে মসজিদ কমিটি বসে এবং সকাল ৮টায় ঈদের নামাজের সময় নির্ধারণ করা হয়। এরপর তা মাইকে ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ঈদের নামাজের পরে মসজিদের উন্নয়ন ও ইমামের বেতন বাড়ানো নিয়ে কথা হয়।’
আকতার হোসেন বলেন, ‘এগুলো নিয়ে তর্কাতর্কি করেন আলম মেম্বারসহ তাঁদের পক্ষের লোকজন। তাঁরা বলেন, “সবকিছুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আমরা কে।” এরপর তাঁরা দুপুরে কয়েক শ লোক নিয়ে এসে অতর্কিতভাবে হামলা চালান।’
ক্ষতিগ্রস্ত নবীন আলী মীর বলেন, ‘আমরা ভয়ে বাড়ি থেকে দৌড়ে চলে গেলেও ফিরে এসে দেখি আমাদের ঘরের কোনো কিছুই নেই। সব লুটপাট করে নিয়ে গেছে। আমরা যারা ইমামে পক্ষে কথা বলেছি এবং মসজিদ কমিটির সদস্যদের বাড়ি বেছে বেছে হামলা চালিয়েছে। এ ঘটনায় আমরা প্রশাসনের কাছে উপযুক্ত বিচার ও ক্ষতিপূরণ চাই।’
হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপি সমর্থক নাজমুল ইসলাম। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতি করার কারণে দীর্ঘ ১৭ বছর জেলজুলুমের শিকার হয়েছি। ঠিকমতো ঘরেও ঘুমাতে পারিনি। এখন বিএনপির নব্য নেতাদের তাণ্ডবে আমার সব শেষ হয়েছে। এই সোহেল মুন্সির আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়ে বিএনপির রাজনীতি করছে এবং বিএনপিকেও ধ্বংস করছে।’
এদিকে রোববার দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শন করেন স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুত তাওয়াব। তিনি অভিযোগ করেন, ক্ষতিগ্রস্তরা বেশির ভাগ জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক এবং কয়েকজন বিএনপি নেতাও রয়েছেন।
এ ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আব্দুত তাওয়াব বলেন, ‘বিএনপির ঘরে বসে যারা সন্ত্রাস করছে, তাঁদের বিচার করতে হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে সোহেল মুন্সি ও ইউপি সদস্য রকিবুল আলম খানের মোবাইল ফোনে একাধিকার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেয়েছি এবং মামলা প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া রাতেই অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন হিসেবে চারজনকে আটক করা হয়েছে।’