যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার আগে, দিন যত গড়াচ্ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টগুলো ততই অস্থির ও অসংলগ্ন হয়ে উঠছিল। তাঁর ভেতরে যেন আতঙ্ক জমে উঠছে, এসব পোস্ট যেন ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ। ইরানের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে তাঁর হামলা এখন তাঁরই সবচেয়ে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে রূপ নিতে যাচ্ছিল।
যে মানুষটি ইরানিদের ‘তোমাদের সরকার তোমারাই দখল করে নাও’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুক্তির কথা বলেছিলেন, তিনিই আবার সেই জনগণকেই ‘প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়া’র হুমকি দিয়েছেন। অথচ, ইরানে হামলা নাকি এই জনগনকে সহায়তার উদ্দেশ্যে ছিল। এই যুদ্ধের শেষ ধাক্কা হিসেবে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারত। তবে শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। সাময়িক একটা বিরতি পাওয়া গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যে প্রেসিডেন্ট হাজার হাজার মেরিন জড়ো করেছিলেন বল প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খোলার জন্য, তিনি এখন অসহায়ভাবে দেখছেন—ইরান ঠিক করছে কোন ট্যাংকারে হামলা হবে আর কোনটি পার হতে পারবে, আর মার্কিন নৌবহর নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ‘টোল’ এখন প্রায় ২০ লাখ ডলার, যা চীনা ইউয়ান বা রাশিয়ার স্ট্যাবলকয়েনে পরিশোধ করা হচ্ছে।
চার সপ্তাহ আগে ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামির দাবি করেছিলেন, ইসরায়েল ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ৮০ শতাংশ ধ্বংস করেছে এবং ইরানে ‘প্রায় পূর্ণাঙ্গ আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করেছে। তবু বাস্তবে দেখা গেছে, নিয়মিতভাবেই মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানি আঘাতের মুখে পড়ছে। বরং যুদ্ধের ষষ্ঠ সপ্তাহে এসে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলেই মনে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা, ট্রাম্পের দৃষ্টিকোণ থেকে ১৩ হাজার বিমান হামলার পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনো অটল দাঁড়িয়ে আছে। ইরান যেন কোনো পূর্বনির্ধারিত চিত্রনাট্য অনুসরণ করছে না। ধারণা ছিল, বহু আগেই তারা ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ইরাক ও সিরিয়ার বাথ পার্টিগুলো এবং লিবিয়ার জামাহিরিয়া (গণরাষ্ট্র) দ্রুত ভেঙে পড়েছিল তাদের নেতা সাদ্দাম হোসেন, বাশার আল আসাদ এবং মুয়াম্মার গাদ্দাফি ধরা পড়েন, নিহত হন বা পালিয়ে যাওয়ার পর।
এই শাসনগুলো খুবই ভঙ্গুর ছিল। কারণ, এগুলো গড়ে উঠেছিল নেতাদের ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক কাঠামোর ওপর। সিরিয়ায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদের পতনের সময় প্রায় কোনো গুলিও ছোড়া হয়নি।
কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। মোসাদ, সিআইএ–এর অনুপ্রবেশ, এমনকি হিজবুল্লাহ ও হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বকে একাধিকবার নির্মূল করার মতো নিখুঁত হত্যাকাণ্ডের পরও ইরানের শাসনব্যবস্থার কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ অক্ষত রয়েছে। ইরানের ভেতরে কোনো রাজনৈতিক বা জাতিগত গোষ্ঠীই এখনো আধিপত্য বা স্বায়ত্তশাসনের দাবি করতে পারেনি—বিশেষ করে ইরানি কুর্দিরা, যারা জানুয়ারির বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় গড়ে ওঠা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থা যেন বিদেশি বোমা ও হত্যাকাণ্ড—দুটোর বিরুদ্ধেই অন্য যেকোনো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মডেলের চেয়ে বেশি প্রতিরোধী। বছরের শুরুতে মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া যেভাবে ইরানকে সহজ লক্ষ্য ভেবেছিলেন, বাস্তবে তা হয়নি; বরং ইরান বিস্ময়কর স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দিয়েছে।
তবে এর মানে এই নয় যে—জানুয়ারির ঘটনাগুলো ভুলে গেছে ইরানের মানুষ। ইরানি প্রবাসীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক চলছে—বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) গণজমায়েতের ওপর সোভিয়েত যুগের ভারী মেশিনগান দুশকা দিয়ে গুলি চালানোর জন্য তাদের নিন্দা করা হবে, নাকি তেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে আনন্দে উল্লাস করা হবে।
কিন্তু ট্রাম্পের হামলার বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে—সেটিই যেন এখন বেশি শক্তিশালী। বলা যায়, ইরানের ভেতরে নতুন প্রজন্মের যোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ লড়াই বিপ্লবের প্রতি সমর্থনকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। ইরানের প্রতি ঘণ্টার প্রতিরোধ যেন সংক্রামক হয়ে উঠছে সাধারণ মানুষের। ইরানের এই অটল অবস্থান আরব বিশ্বের সেই দেশগুলোকেও অনুপ্রাণিত করছে, যারা আগে থেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি ইতিবাচক বা নিরপেক্ষ ছিল। তবে যেসব দেশে ইরানের সাম্প্রদায়িক হস্তক্ষেপের কারণে শত্রুতা ছিল, সেখানেও এখন এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে—কে ফিলিস্তিনের জন্য বেশি কিছু করতে পারে।
এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় যে, গত সপ্তাহে সিরিয়াজুড়ে বিক্ষোভ দেখা গেছে—ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে পাস হওয়া সেই আইনটির বিরুদ্ধে, যেখানে ‘সন্ত্রাসবাদে’ দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গত শুক্রবার রাজধানী দামেস্কে বিক্ষোভ শুরু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দারা, কুনেইত্রা, আলেপ্পো, লাতাকিয়া, হোমস ও ইদলিবে। ইউনিভার্সিটি অব আলেপ্পোর ক্যাম্পাস ভরে যায় হাজারো শিক্ষার্থীতে। তারা সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়ে স্লোগান দেয়, ‘আমাদের প্রাণ, আমাদের রক্ত—সব দিয়ে তোমাকে মুক্ত করব, ফিলিস্তিন।’
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালে আলেপ্পো, দারা, হোমস এবং ইদলিবে কী ঘটেছিল—শুধু একবার মনে করে দেখুন। বিদ্রোহী মিলিশিয়াগুলো কার বিরুদ্ধে লড়ছিল সেটাও মনে করুন। স্থলভাবে বিদ্রোহীরা হিজবুল্লাহ ও আইআরজিসি এবং আকাশ পথে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়েছিল।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভগুলো দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের প্রতিফলন। তবে এর সময়কাল প্রভাবিত হয়েছে ইরানের সেই অবস্থান থেকে, যেখানে তারা ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে—যে যুদ্ধবিমানগুলো দক্ষিণ সিরিয়াকে আকাশপথ হিসেবে ব্যবহার করে।
সিরিয়ার কোয়ান্তারায় ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বাড়ছে। কিছু বিক্ষোভকারী সামনের সারির এলাকায় এগিয়ে গেলে ইসরায়েলি বাহিনী ফ্লেয়ার ছোড়ে। একই দিনে, শুক্রবার কুনেইত্রা অঞ্চলের গ্রামীণ এলাকায় একটি গাড়িতে গোলাবর্ষণ করে ইসরায়েলি বাহিনী, এতে ভেতরে থাকা সবাই নিহত হয়।
ইসরায়েলি আধিপত্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জর্ডানেও ধিকিধিকি জ্বলছে। দেশটির রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ পশ্চিমাপন্থী এবং ইরানবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত। তাঁর বাবা জানতেন কখন এবং কীভাবে ‘জর্ডানের সিংহ’ হয়ে উঠতে হয়, কিন্তু আবদুল্লাহ ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রাথমিক শিক্ষা দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে বারবার ভুল সময়ে সামনে চলে এসেছে।
জর্ডান জেরুসালেমের পবিত্র মসজিদ আল আকসার অভিভাবক। ইসরায়েল রোজায় সেই ঐতিহাসিক মসজিদে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেয়। যার ফলে, জর্ডানজুড়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠে। প্রতিক্রিয়ায় গণগ্রেপ্তার শুরু করে সরকার এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে দেশজুড়ে মসজিদগুলোর চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনী ও জেন্ডারমেরি মোতায়েন করা হয়।
সম্প্রতি একটি জর্ডানিয়ান বাস্কেটবল দলের সমর্থকেরা স্লোগান দিয়েছেন—‘আল-আকসা আমার হৃদয়ে, আমরা সেখানে যাব। তোমার প্রাঙ্গণে নামাজ পড়ব। তোমার পানি পান করব।’ এটা কোনো ফাঁকা বুলি নয়। জর্ডানের সাংবাদিক আলি ইউনূস সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘জর্ডানি জনগণের বিশাল অংশ এই যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানকে সমর্থন করে—যদিও গ্রেপ্তারের ভয়ে প্রকাশ্যে তা বলে না। আর যারা দেশটিকে ভালোভাবে চেনে, এমনকি বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বিষয়টি স্পষ্ট।’
এই বিতর্কে জর্ডানের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। মিসরের পর ১৯৯৪ সালে জর্ডানই ছিল দ্বিতীয় আরব দেশ, যে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। মিসরীয় বিশ্লেষক মামুন ফাদি এক শক্তিশালী যুক্তি তুলে ধরেন। ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস ও আঞ্চলিক শান্তির বয়ানের সঙ্গে বাস্তবতার তীব্র বৈপরীত্য তিনি দেখান—যেখানে এই দুই দেশই ঘৃণার জন্ম দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল আবার আগের অবস্থানেই ফিরে গেছে—আরবদের শত্রু হিসেবে, এমনকি যেসব দেশ শান্তিচুক্তি করেছে, যেমন মিসর, জর্ডান, এমনকি আমার মতে আমিরাতের ভেতরেও, সেটা বাহরাইন হোক বা ইউএই—এখন ইসরায়েল সম্পূর্ণভাবে আরবদের শত্রুর কাতারে।’ তিনি বলেন, ‘তাই আপনি যে শান্তি তৈরি করছেন, সেটি এক ধরনের কল্পনা, বিভ্রম, মরীচিকা...আপনি যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা টেলিভিশনে ইসরায়েল বা এমনকি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসকে সমর্থন করেন, আপনাকে প্রকাশ্যে লিঞ্চ করা হবে বা গণপিটুনি দেওয়া হবে।’
এই ঘৃণা শুধু গত দুই বছরে গাজা, লেবাননে অব্যাহত হামলা, আরব জনমনে অপমানবোধ, কিংবা ব্রিটেন ও ইউরোপের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে যুদ্ধবিমান যন্ত্রাংশ, তেল ও আন্তর্জাতিক আইনের দায়মুক্তি দেওয়ার কারণে তৈরি হয়নি। এটি আরও একটি প্রতিক্রিয়া—ইসরায়েল এখন তার আশপাশে বসবাসকারী সবার জন্য যে হুমকি হয়ে উঠেছে; সিরিয়ার, লেবানিজ, জর্ডানিয়ান এবং মিসরীয় সবার জন্য।
ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ফল নয়। বরং এটি ইরানের পূর্বপরিকল্পিত কৌশলের ফল—যা গত বছর আক্রমণের পর তারা বারবার প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিল। ইরানি কূটনীতিকরা সবার কাছে বলেছিলেন, পরের বার তাদের ওপর হামলা হলে, তারা পুরো বিশ্বকে তার পরিণতি অনুভব করাবে। এ ক্ষেত্রে তারা তাদের কথার প্রতি সত্য থেকেছে। গাজায় গণহত্যা বিশ্বজুড়ে নৈতিক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঢেউ তুলেছিল, কিন্তু তা অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেনি।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে তেল ও গ্যাস উৎপাদন বন্ধে বাধ্য করার ফলে বিশ্বের প্রতিটি তেল ও গ্যাস ব্যবহারকারী দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই প্রভাব আগামী কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক বাজারকে অস্থির করে রাখবে। ইরানে হামলার পর থেকে ইউরোপে ডিজেলের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে।
ট্রাম্পের এই হামলা ইরানকে এমন এক ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ উপহার দিয়েছে, যা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি কার্যকর ও তাৎক্ষণিক। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি নিয়ে প্রচলিত ধারণা ছিল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের মতোই ইরানেরও তেল রপ্তানির জন্য এই প্রণালি সমানভাবে প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবতা দেখিয়েছে, এটি ছিল এক মারাত্মক ভুল হিসাব।
পরবর্তী পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, ইরান তার নতুন পাওয়া এই কৌশলগত সুবিধা শুধু একটি সাধারণ যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে ছাড়বে না। কারণ নেতানিয়াহু যেকোনো সময় তা ভেঙে আবার কোনো বিজ্ঞানীকে হত্যা করতে পারেন। গত এক সপ্তাহে ইরানে দুটি শান্তি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিনিময়ে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি হবে এবং ১৫-২০ দিনের মধ্যে একটি বিস্তৃত চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে। অন্যদিকে, ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ বলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে সীমা আরোপ করতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে পারে। কিন্তু দেশে তাঁর এই প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়া মোটেও ইতিবাচক ছিল না। কট্টরপন্থীরা তাঁকে বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি দেয়।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি সাঈদ হাদ্দাদিয়ান শুক্রবার রাতে জাভেদ জারিফকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি অর্থহীন কথা বলছেন এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উপদেশ দেওয়ার কোনো অধিকার আপনার নেই...আপনার কাছে তিন দিন সময় আছে অনুতপ্ত হয়ে আপনার মন্তব্য প্রত্যাহার করার।’
জাভেদ জারিফ ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় ইরানের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তির মূল স্থপতি। সেই চুক্তি ইরান মেনে চললেও যুক্তরাষ্ট্র তা করেনি। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত ছিল, বরং আরও কঠোর হয়েছে। ফলে এখন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বোঝানো কঠিন যে, ইরানকে একই ভুল দ্বিতীয়বার করা উচিত।
যদি হরমুজ প্রণালির কোনো সামরিক সমাধান না থাকে, তাহলে এটি কেবল ইরানের সম্মতিতেই খুলতে পারে। সেই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দুটি পথ খোলা—হয় তারা সম্মিলিতভাবে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করবে, নয়তো একে একে আলাদাভাবে মোকাবিলা করবে।
যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, এত বিধ্বংসী এক যুদ্ধের পর ইরান তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর থাকা এই চাপ—এবং এর মাধ্যমে বৈশ্বিক ডিজেল ও গ্যাসের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ—সহজে ছাড়বে না। এর জন্য তারা চাইবে বড়, ধারাবাহিক ও যাচাইযোগ্য আর্থিক সুবিধা।
বিশ্লেষক মোহাম্মদ এসলামি ও জয়নাব মালাকুতি লিখেছেন, ‘ট্রাম্প মনে করছেন, তেহরান যুদ্ধবিরতি বা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে এই প্রণালিকে দর–কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তু এই ধারণা ভুল হতে পারে। ইরান সম্ভবত প্রণালিটিকে যুদ্ধ শেষ করার উপায় হিসেবে নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার স্থায়ী উপাদান হিসেবে ভাবছে।’
হরমুজ প্রণালি থেকে আদায় করা ফি থেকে ইরানের আয় একসময় দেশটির তেল থেকে আয়ের চেয়েও বেশি হতে পারে। বিষয়টি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য মেনে নেওয়া কঠিন হবে। কিন্তু এই দেশগুলোর সামনে যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা ছাড়া উপায় নেই—নয়তো তাদের ছাড়া নতুন ব্যবস্থাটি গড়ে উঠবে বলে মনে করেন এসলামি ও মালাকুতি।
ইরানের সর্বশেষ পাল্টা প্রস্তাবে—যা ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছিলেন—প্রতি ট্যাংকার থেকে ২০ লাখ ডলার টোল নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, এই অর্থ ওমানের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হবে। এ কারণেই সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো যেভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে, সেই পথে অন্য কোনো উপসাগরীয় দেশের এগোতে অনীহা স্পষ্ট।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে বিপর্যয়ের চিত্র এখন আর লুকোনো যাচ্ছে না। নিজেদের সব শক্তি প্রয়োগ করেও ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে থামাতে পারেনি এই দেশগুলো। অথচ তাদের শিল্পকারখানা, বিমানবন্দর, এমনকি বিলাসবহুল হোটেলগুলোও ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একের পর এক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবুও সবাই জানে, ট্রাম্প যখন ‘বিজয়’ ঘোষণা করে সরে দাঁড়াবেন, তখন তাদের ভবিষ্যৎ প্রতিবেশী কে হবে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
এই সংঘাতের শেষে গালফ রাষ্ট্রগুলোর সামনে একটাই কঠিন উপলব্ধি এসে দাঁড়িয়েছে—ট্রাম্প ও তার পরিবারের ওপর যে বিপুল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ তারা করেছিল, তার প্রতিদান তারা পেয়েছে ভয়াবহ ক্ষতির মধ্য দিয়ে। তাদের তেল ও গ্যাস শিল্প ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। নিজস্ব ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো তাদের কোনো সুরক্ষা দিতে পারেনি। বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে তারা হারিয়েছে অগণিত বিলিয়ন ডলার।
এরপরও যদি কিছু বাকি থাকে, সেটি হলো ট্রাম্প এখন সরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন—বলা ভালো এরই মধ্যে প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছেন—এবং দাবি করছেন ইরানকে ধ্বংস করার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এই যুদ্ধ পরবর্তী বাস্তবতায় চীনের দিকে তাকানো—একটি আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য অংশীদার খোঁজার আকাঙ্ক্ষা—গালফ রাষ্ট্রগুলোর কাছে এখন অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
কিন্তু ট্রাম্প যদি ইরান থেকে সরে দাঁড়ান, তবে তিনি এমন এক ইরানকে রেখে যাবেন, যা ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনবাহিনী প্রথমবার জড়ো হওয়ার সময়ের তুলনায় আরও শক্তিশালী কৌশলগত অবস্থানে থাকবে।
ট্রাম্প ছিলেন নেতানিয়াহুর বহুদিনের স্বপ্ন। নেতানিয়াহু তাঁর পুরো রাজনৈতিক জীবন ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন—আর সেই জীবনের লক্ষ্য পূরণের এই মুহূর্তে তিনি অজান্তেই ধনী-গরিব, সুন্নি-শিয়া—সব ইরানি ও আরব জনগণকে একত্র করে ফেলেছেন, যা আগে কখনো ঘটেনি।
গালফ অঞ্চলের এই ধ্বংসস্তূপ নেতানিয়াহুর রক্তপিপাসাকে সাময়িকভাবে তৃপ্ত করতে পারে, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি খুব শিগগিরই উত্তরের দিকে ঘুরবে। তাঁর সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনার প্রথম লক্ষ্য হবে তুরস্ক, এবং পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে তিনি দখল করতে চাইবেন দক্ষিণ সিরিয়ার সেই ভূখণ্ড, যা ইসরায়েলি সীমান্ত ও দ্রুজ এনক্লেভের মধ্যে অবস্থিত।
তবে এই পরিকল্পনার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ব্যর্থতার বীজ। নেতানিয়াহু এখনো তা উপলব্ধি করতে পারেননি, কিন্তু দক্ষিণ লেবানন ও দক্ষিণ সিরিয়া নিয়ন্ত্রণ করে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ার তার স্বপ্ন ইতিমধ্যেই ইরানে গিয়ে ভেঙে পড়েছে। বাস্তবতার মাটিতে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ কোনো আরব জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আর একটি দুর্বল ইসরায়েল খুব শিগগিরই বুঝতে পারবে, তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের প্রতিটি কোণে ‘ঘাস কাটা’—অর্থাৎ দমননীতি চালানোর মতো সম্পদ তাদের হাতে নেই।
ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা—অনুগত আরব স্বৈরশাসকদের একটি নেটওয়ার্কের ওপর—যারা জনগণের ক্ষোভ দমন করে রেখেছিল—এই সূত্রটিও আর বেশি দিন কার্যকর থাকবে না। শুধু একটি আরব স্বৈরশাসকের পতনই পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে। ২০১১ সালের মিসরীয় বিপ্লবের অন্যতম মুখ, মোহাম্মদ এলবারাদেই একবার বলেছিলেন—আরব বসন্ত মারা যায়নি; এটি কেবল সুপ্ত অবস্থায় আছে। কিন্তু আজকের দারিদ্র্য, ক্ষমতাহীনতা, অবিচার ও দুর্নীতির চিত্র সেই সময়ের তুলনায় আরও স্পষ্ট ও তীব্র।
যদি আবার আরব বসন্ত জেগে ওঠে, তাহলে ২০১৩ সালের মতো কোনো শক্তিশালী সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাত আর থাকবে না, যারা বিপুল অর্থ ব্যয় করে সেই আন্দোলনকে দমন করতে পারবে। ইসরায়েলের উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত তখন উন্মুক্ত হয়ে যাবে—সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদানসহ সমগ্র ইসলামী বিশ্বের যোদ্ধারা সেখানে ঢুকে পড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানকে ধ্বংসস্তূপে রেখে যাওয়া—ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর জন্য বুদ্ধিমানের কাজ নাও হতে পারে। তাদের এই বিজয় হয়তো খুব অল্প সময়ের জন্যই টিকে থাকবে। একটি জ্বলন্ত অঞ্চলই প্রমাণ করে দেয়—কার রাজনৈতিক পূর্বাভাস সঠিক ছিল। আর এই মুহূর্তে তা সত্যি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে ইয়াহিয়া সিনওয়ারের অবস্থান। হামাসের এই নেতা, যিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়েছিলেন। তিনি যে শতাব্দীপ্রাচীন এই সংঘাত আর কখনো আগের মতো থাকবে না বলে যে ঝুঁকি নিয়েছিলেন, তা আজ বাস্তবতার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে।
লেখক: ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক। তিনি মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। এর আগে তিনি দ্য গার্ডিয়ানে বিদেশি সম্পাদকীয় লেখক হিসেবে কাজ করেছেন। এ ছাড়া তিনি রাশিয়া, ইউরোপ এবং বেলফাস্টে সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্য স্কটসম্যান থেকে তিনি গার্ডিয়ানে যোগ দেন, যেখানে তিনি শিক্ষা বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান
আরও পড়ুন: