বিশ্বজুড়ে এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) রাজত্ব। এ অবস্থায় উদ্বেগ বেড়ে গিয়েছে ভারতের প্রযুক্তি খাতের। ৩০০ বিলিয়ন ডলারের ব্যাক-অফিস বা আউটসোর্সিং শিল্পকে ধ্বংস করে দিতে পারে এআই—এমন আশঙ্কায় গত কয়েক সপ্তাহে ভারতের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। প্রচলিত সফটওয়্যার ও আইটি খাতের শেয়ারের বিশ্বব্যাপী দরপতনের অংশ হিসেবে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও ভারতের জন্য এর গুরুত্ব অনেক বেশি।
গত সাড়ে তিন দশকে ভারতের সফটওয়্যার শিল্প লাখ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। এর ওপর ভর করেই দেশটিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন এক বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে। এই খাতের আয় গত ৩০ বছর ধরে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও গুরগাঁওয়ের মতো বড় শহরগুলোতে অ্যাপার্টমেন্ট, গাড়ি ও রেস্তোরাঁর চাহিদাকে চাঙা রেখেছে।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, ভারতের ১০টি শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার কোম্পানির সূচক ‘নিফটি আইটি’ এ বছর প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে, যাতে বিনিয়োগকারীদের কয়েক হাজার কোটি ডলারের মূলধন উবে গেছে।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে এনথ্রোপিক-এর ‘ক্লদ’ এজেন্ট একটি নতুন টুল বাজারে আনার ঘোষণা দিলে এই আতঙ্ক শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই টুল আইনি জটিলতা ও ডেটা প্রসেসিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে সক্ষম। এটি মূলত ভারতের শ্রমনির্ভর আইটি শিল্পের ব্যবসায়িক মডেলে সরাসরি আঘাত হেনেছে।
এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়, যখন কিছু উদ্যোক্তা সতর্ক করেন যে ২০৩০ সালের মধ্যে আইটি সেবা খাতের অনেক কাজ বিলুপ্ত হতে পারে। এমনকি কোনো কোনো প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এমনও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এআই এন্ট্রি-লেভেলের হোয়াইট-কলার চাকরির ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে।
এই উদ্বেগের মধ্যে ভারতের আইটি জায়ান্টগুলো পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের দাবি, এই আতঙ্ক অতিরঞ্জিত। এআই নতুন সুযোগ তৈরি করবে, যদিও এতে কাজের ধরনে কাঠামোগত পরিবর্তন আসবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।
বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ ব্যাংক জেফারিস এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজের ধরন এখন পরামর্শ (অ্যাডভাইজরি) ও বাস্তবায়নের দিকে ঝুঁকে পড়বে। এতে অ্যাপ্লিকেশন ম্যানেজড সার্ভিসেস বা প্রথাগত সেবা খাত থেকে আয় ব্যাপকভাবে কমে যেতে পারে।’
সহজভাবে বললে, ব্যাংক বা তেল কোম্পানির মতো গ্রাহকদের সফটওয়্যার চালানো, বাগ ঠিক করা ও আপডেট ব্যবস্থাপনার জন্য যে ফি পেত ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলো, তা কমে যাবে। পরিবর্তে পরামর্শভিত্তিক উচ্চমূল্যের কিন্তু কম নিয়মিত কাজ বাড়বে।
জেফারিসের মতে, এটি আয়ের প্রবৃদ্ধি ও কর্মীদের চাহিদার ওপর মৌলিক প্রভাব ফেলবে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছর আইটি কোম্পানিগুলোর আয় ৩ শতাংশ কমে যেতে পারে এবং ২০৩১ সালের পর প্রবৃদ্ধি পুরোপুরি থমকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সব মতামত নেতিবাচক নয়। জেপি মরগান চেজ আইটি ফার্মগুলোকে ‘প্রযুক্তি বিশ্বের প্লাম্বার’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, এআই জটিল কাজ দ্রুত করতে পারলেও সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো গ্রাহককে যেভাবে কাস্টমাইজড সেবা দেয়, সেটি এআইয়ের পক্ষে একা দেওয়া সম্ভব নয়। বরং তারা মনে করে, এআই টুল নির্মাতা ও আইটি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব বাড়বে, যা কাজের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে।
ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম আইটি প্রতিষ্ঠান ইনফোসিসের সিইও সলিল পারেখও একই কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এআই বরং সুযোগ বাড়াচ্ছে। বুদ্ধিমান টুল ব্যবহারের মাধ্যমে পুরোনো সিস্টেমগুলোকে আধুনিক করতে গ্রাহকদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিষ্ঠানের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোই সবচেয়ে উপযুক্ত অবস্থানে আছে।
ইনফোসিসের হিসাব অনুযায়ী, জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে ফ্রন্ট-এন্ড ডেভেলপার ও টেস্টারদের মতো ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ কাজ হারালেও ডেটা অ্যানোটেটর এবং এআই ইঞ্জিনিয়ারদের মতো নতুন ১৭ কোটি পদের সৃষ্টি হবে।
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এখন এই মতের সঙ্গেই একমত হচ্ছেন। এইচএসবিসি তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে এআই বিস্তারের প্রধান মাধ্যম হবে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোই।
‘সফটওয়্যার উইল ইট এআই’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহৎ এআই সিস্টেমে মৌলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাই এগুলো দিয়ে বড় বড় এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মের সরাসরি প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। যদিও ছবি তৈরির মতো কিছু ক্ষেত্রে এগুলো কার্যকর হতে পারে।
এইচএসবিসি আরও যোগ করেছে, বহু দশক ধরে তৈরি এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার প্রায় ত্রুটিমুক্ত, উচ্চ গতিসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য। এসব গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যক্তিগত মেধাস্বত্ব (আইপি) উন্মুক্ত ইন্টারনেটের তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে জটিল সফটওয়্যার আর্কিটেকচার তৈরিতে এআই এখনো অনেক পিছিয়ে।
তবুও, এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ধাক্কা থেকে আইটি খাত পুরোপুরি রেহাই পাবে না। জেপি মরগান বলছে, এর সুনির্দিষ্ট প্রভাব এখনই পরিমাপ করা কঠিন হলেও শিল্পের বিভিন্ন স্তরে এর কম্পন অনুভূত হচ্ছে।
ভারতের সফটওয়্যার খাতের সংগঠন ন্যাসকমের মতে, শিল্পটি ইতিমধ্যে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে শুরু করেছে। ২০২৫ সাল হবে এই খাতের একটি বাঁক বদলের বছর, যখন প্রযুক্তি শিল্প এআই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে সরাসরি এটি বাস্তবায়নের পথে হাঁটা শুরু করেছে।
তবে ২০২৫ সালে মোট ৩১৫ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে এআই–সম্পর্কিত প্রকল্প থেকে আয় মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরে খাতটির সামগ্রিক আয় প্রায় ৬ শতাংশ বাড়তে পারে, যা আগের সময়ের তুলনায় অনেক কম।
অন্যদিকে, কর্মী নিয়োগের হারও থাকবে মন্থর। ২০২৬ সাল নাগাদ নতুন কর্মী নিয়োগের হার মাত্র ২.৩ শতাংশ বাড়তে পারে। এআইয়ের ফলে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল আদায়ের ধরনও বদলাচ্ছে। কাজের ঘণ্টা নয়, বরং ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণের প্রবণতা বাড়ছে বলে জানিয়েছে ন্যাসকম।
স্বল্পমেয়াদে এই খাতের জন্য চাপ এড়ানো কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। নুভামা ইনস্টিটিউশনাল ইকুইটিজের মতে, আইটি ফার্মগুলোর আয় প্রাথমিকভাবে কমবে এবং এআইয়ের সুফল কেবল মধ্যমেয়াদে দৃশ্যমান হবে।
প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ ছাড়াও অন্যান্য চাপ রয়েছে। ভারতের জন্য শুল্ক–সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা বিধিনিষেধ বেড়েছে। মুডিস অ্যানালিটিকসের মতে, নতুন ভিসা ফির কারণে ভারতের শীর্ষ আইটি কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় ১০ থেকে ২৫ কোটি ডলার বাড়তে পারে, যা তাদের আয়ের প্রায় ১ শতাংশ। ভারতের সামগ্রিক সেবা রপ্তানির ৮০ শতাংশই আসে এই খাত থেকে, তাই বর্তমান পরিস্থিতি এই শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।