আটলান্টা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন স্প্যানিশ সমর্থকদের উৎসব শুরুর অপেক্ষা। ম্যাচের ৩৯ মিনিটে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা কুকুরেয়ার মাইনাস থেকে ফেরান তোরেসের বুলেট গতির শট পোস্টে লেগে ফিরে এলো, আর ফিরতি বলে নেওয়া তোরেসেরই দ্বিতীয় শটটি যখন জালে জড়ানোর জন্য যাচ্ছিল, তখনই দেখা গেল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। বাজপাখির মতো উড়ে গিয়ে বলটি বারের ওপর দিয়ে ভাসিয়ে দিলেন ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার এক গোলরক্ষক। ঠিক ৫ মিনিট পর আবারো তোরেসের নিচু শট ডানে ঝাঁপিয়ে রুখে দিলেন তিনি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে এমেরিক লাপোর্তের হেডও তাঁর বিশ্বস্ত গ্লাভসকে ফাঁকি দিতে পারেনি।
তবে প্রথমার্ধের এই প্রতিরোধ ছিল কেবল শুরু। দ্বিতীয়ার্ধে স্প্যানিশ আক্রমণের তীব্রতা আরও বাড়ে। পুরো ম্যাচে স্পেনের আক্রমণভাগ কেপ ভার্দের গোলমুখে মোট ২৭টি শট নেয়, যার মধ্যে ১৬টিই ছিল ডি-বক্সের ভেতর থেকে। কিন্তু স্পেনের লক্ষ্যে থাকা ৭টি শটের প্রতিটিই অতিমানবীয় দক্ষতায় প্রতিহত করেন এই ‘চল্লিশোর্ধ্ব তরুণ’। নাম তার জোসিমার জোসে ইভোরা দিয়াস, অবশ্য ফুটবল বিশ্ব তাঁকে ‘ভোজিনিয়া’ নামেই চিনে থাকে। তাঁর এই অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্সে ভর করেই বিশ্বকাপ ইতিহাসে নিজেদের প্রথম ম্যাচে স্পেনের মতো পরাশক্তিকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে রেখে ঐতিহাসিক এক পয়েন্ট অর্জন করল কেপ ভার্দে।
বিশ্বমঞ্চে প্রথম ম্যাচেই আলো ছড়ানো এই গোলরক্ষকের ডাকনামটি নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই। পর্তুগিজ ভাষায় ভোজিনিয়া শব্দের অর্থ মূলত ‘ছোট দাদি/নানি’। শৈশবে কেপ ভার্দের সাঁও ভিনসেন্টে দ্বীপে তাঁর বেড়ে ওঠার গল্পের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এই নাম। ফিফা ওয়েবসাইটকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ডাকনামটি মূলত আমার দাদা-দাদির কারণে। আমি কখনো আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকিনি। যখন আমার জন্ম হয়, আমার বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। আর আমার মাকে সবসময় কাজের জন্য ব্যস্ত থাকতে হতো। তাই আমি সবসময় আমার দাদা-দাদী ও নানা-নানীর কাছেই বড় হয়েছি। আমার পাড়ার ছেলেরা আমার চেয়ে অনেক বড় ছিল, আর আমি সবসময় রাস্তায় খেলতাম এবং প্রচুর মার খেতাম।’
ভোজিনিয়ার পেশাদার ফুটবলে আসার পথটিও বেশ দীর্ঘ। আধুনিক ফুটবলে যেখানে তরুণ বয়সেই খেলোয়াড়রা লাইমলাইটে আসেন, সেখানে তিনি ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত কেপ ভার্দের ঘরোয়া লিগেই খেলতেন। ২০১১ সালে অ্যাঙ্গোলার ক্লাব প্রোগ্রেসো দো সাম্বিজাঙ্গার হয়ে প্রথম পেশাদার চুক্তিতে দেশ ছাড়েন তিনি। এর ছয় মাস পর ক্যামেরুনের বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানের জয়ে জাতীয় দলে তাঁর অভিষেক হয়, যা ২০১৩ সালে কেপ ভার্দেকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিয়ে যায় আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে।
গত ১৪ বছর ধরে জাতীয় দলের গোলপোস্ট সামলানো ভোজিনিয়ার জন্য স্পেনের বিপক্ষের ম্যাচটি ছিল ৯০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগেই ক্লাবহীন হয়ে পড়েন তিনি; শেষ হয়ে যায় পর্তুগিজ ক্লাব জিদি চাভেসের সঙ্গে তাঁর চুক্তির মেয়াদ। তবে সম্পূর্ণ ক্লাবহীন থাকার এই মানসিক চাপ মাঠের পারফরম্যান্সে বিন্দুমাত্র পড়তে দেননি ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত স্পেনের একের পর এক আক্রমণ যেভাবে তিনি একাই বিনষ্ট করেছেন, তাতে ঐতিহাসিক এই ড্রয়ের নায়ক নিঃসন্দেহে তিনিই। শৈশবে দাদা–দাদির কোলে বেড়ে ওঠা সেই ভোজিনিয়া এবার নিজের নাতি–পুতিদের নিয়ে গল্প করার রসদও জুগিয়ে নিলেন।