ছারপোকা এক বিভীষিকার নাম। একবার বাসায় প্রবেশ করতে পারলে এর থেকে মুক্তি মেলা বেশ কঠিন। বিশেষ করে ছাত্রাবাস বা পাবলিক প্লেসগুলোতে ছারপোকার দেখা মেলে অহরহ। আবার অনেক সময় আপনি এদের দেখা পাবেন না কিন্তু এরা ঠিকই তাদের অস্তিত্ব জানান দেবে। ছারপোকার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে যাওয়া মানুষদের জন্য এক সহজ সমাধান হঠাৎ করেই এক ল্যাবরেটরিতে ভুল করে আবিষ্কৃত হয়ে গেছে।
দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট ইউকে এক প্রতিবেদনে জানায়, ল্যাবরেটরিতে কাজ করার সময় একটি ছোট্ট দুর্ঘটনা থেকে বের হয়ে আসে যে ছারপোকা পানি ও আর্দ্রতাকে যমের মতো ভয় পায়। নতুন এক গবেষণায় উঠে আসা এ তথ্য আক্রমণাত্মক এই পোকাটির বিস্তার নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
ছারপোকা (Cimex lectularius) মূলত একটি রক্তচোষা পতঙ্গ। এরা খুব দ্রুত ঘরের মধ্যে বংশবিস্তার করতে পারে এবং একবার জেঁকে বসলে এদের দূর করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
বিগত ২০ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে ছারপোকার পুনরুত্থান ঘটেছে। এর প্রধান কারণ হলো রাসায়নিক কীটনাশকের বিরুদ্ধে এই পতঙ্গগুলোর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়া। তাই গবেষকেরা এদের দমনের কার্যকর উপায় খুঁজতে এদের আচরণ গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছেন।
নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে, ছারপোকা পানি এবং ভেজা জায়গা এড়িয়ে চলে। তাদের এই আচরণের কথা আগে জানা ছিল না।
গবেষকরা বলছেন, এই বিস্ময়কর ফলাফলটি পোকাটির শারীরিক গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ছারপোকার দেহ খুব চ্যাপ্টা এবং পেটের দুই পাশে ছোট ছোট শ্বাসপ্রশ্বাসের ছিদ্র থাকে, যেগুলোকে স্পাইরাকল বলা হয়।
‘জার্নাল অব ইথোলজি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণার অন্যতম লেখক ডং হোয়ান চো বলেন, ‘তারা যদি কোনোভাবে পানির সংস্পর্শে আসে, তবে তাদের শরীর পানির উপরিভাগে আটকে যাবে। এতে তাদের শ্বাস নেওয়ার ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া রিভারসাইডের এই কীটতত্ত্ববিদ আরও বলেন, ‘পানির প্রবল আঠালো শক্তির কারণে এটি ছারপোকার কাছে অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। তাই তারা যে আর্দ্রতা থেকে দূরে থাকতে চায়। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।’
ল্যাবে গবেষণার কাজ চলাকালে দুর্ঘটনাবশত এই বিষয়টি সামনে আসে। গবেষকেরা ছোট কাচের শিশিতে (ভায়াল) ছারপোকা রেখেছিলেন। শিশির ওপরে রক্তভর্তি একটি কৃত্রিম ফিডার বসাতেন। পোকাগুলো ওপরে উঠে একটি পাতলা ঝিল্লির (মেমব্রেন) ভেতর দিয়ে মুখ ঢুকিয়ে রক্ত পান করত।
একবার একটি শিশির ঝিল্লি সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ফিডার থেকে রক্ত চুইয়ে ভেতরে থাকা একটি কাগজের টুকরোয় পড়তে থাকেপোকাগুলোকে ধরার সুবিধার জন্য ওই কাগজটি রাখা হয়েছিল।
ড. চো বলেন, ‘রক্ত চুইয়ে ভেতরে গিয়ে কাগজটি ভিজে যাচ্ছিল। আমি ভেবেছিলাম ছারপোকাগুলো হয়তো কাগজ থেকে রক্ত পেয়ে খুশিই হবে। কিন্তু দেখলাম, সম্পূর্ণ উল্টো বিষয় ঘটল। কাগজের যে অংশটি রক্তে ভিজে গিয়েছিল, তারা সেটি এড়িয়ে চলছিল। এমনকি ভেজা অংশের ধারেকাছেও তারা ঘেঁষছিল না।’
এরপর বিজ্ঞানীরা রক্ত নয়, শুধু পানি দিয়ে কাগজটি ভিজিয়ে পরীক্ষা করেন যে আসলে আর্দ্রতাই এর জন্য দায়ী কি না। তাঁরা দেখেন, ছারপোকাগুলো পানির ভেজা অংশও এড়িয়ে চলছে।
পরবর্তী পরীক্ষায় দেখা গেছে, পুরুষ বা স্ত্রী এবং ছোট বা বড়, সব ধরনের ছারপোকাই ভেজা জায়গা এড়িয়ে চলে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভেজা জায়গার দিকে যাওয়ার চেয়ে তারা অনেক দ্রুত সেখান থেকে সরে আসছে। এমনকি হঠাৎ দ্রুত ‘ইউ-টার্ন’ও নেয়।
গবেষকেরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার ছারপোকা দমনের কৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
কারও সন্দেহ হলে যে তাঁর শরীরে ছারপোকা থাকতে পারে, সে ক্ষেত্রে একটি সহজ সমাধানের কথাও জানিয়েছেন গবেষকেরা। চো বলেন, ‘গোসল করুন। তাতেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অবশ্য ঘর বা বিছানায় থাকা ছারপোকা দূর করতে ভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োজন হবে।’