মহাকাশ গবেষণায় আধিপত্য বিস্তারের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যেই পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র নিয়ে গবেষণায় এক বিরল যৌথ অভিযানে নেমেছে চীন ও ইউরোপ। সূর্যের ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে এই চৌম্বক ক্ষেত্র কীভাবে পৃথিবীকে রক্ষা করে, তা জানাই এই মিশনের মূল লক্ষ্য।
‘স্মাইল’ নামের ২.৩ টন ওজনের স্যাটেলাইটটি বৃহস্পতিবার ফ্রেঞ্চ গায়ানার ইউরোপীয় স্পেসপোর্ট থেকে ভেগা-সি রকেটের মাধ্যমে উৎক্ষেপণ করা হবে। এটি উত্তর মেরুর ১ লাখ ২১ হাজার কিলোমিটার ওপর দিয়ে একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথে আবর্তন করবে। মূলত সৌরঝড় বা ‘স্পেস ওয়েদার’ কীভাবে তৈরি হয় এবং তা কীভাবে পৃথিবীর যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ গ্রিড ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের ক্ষতি করে, তা আগেভাগে জানানোই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
২০১৬ সালে যখন চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেস (সিএএস) এবং ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি (ইএসএ) এই প্রকল্পে সম্মত হয়েছিল, তখন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি সহযোগিতার জন্য অনেক বেশি অনুকূল ছিল। তবে ইএসএর ডিরেক্টর জেনারেল জোসেফ অ্যাসবাখার জানিয়েছেন, বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয় থাকলেও পরবর্তী কোনো মিশনের বিষয়ে আপাতত কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এবং ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি নাসার ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তা সত্ত্বেও চীন ও ইউরোপ মহাকাশ গবেষণার দুয়ার খোলা রাখতে চায়।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংবেদনশীল প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা বিধি এবং কারিগরি সমস্যার কারণে মিশনটি অন্তত এক বছর পিছিয়ে যায়। চীনা স্যাটেলাইট প্ল্যাটফর্ম ও যন্ত্রপাতি নেদারল্যান্ডসে ইএসএর সেন্টারে স্থানান্তরের জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। এমনকি স্যাটেলাইটের হিট পাইপে থাকা অ্যামোনিয়াকে ‘বিপজ্জনক পণ্য’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন ধাপে যাচাই করে অনুমোদন দেওয়া হয়।
‘স্মাইল’ স্যাটেলাইটে চারটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক যন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের লিসেস্টার ইউনিভার্সিটির তৈরি একটি সফট এক্স-রে ইমেজার প্রথমবারের মতো চৌম্বক ক্ষেত্রের সীমানা মানচিত্র তৈরি করবে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মহাকাশবিজ্ঞানী কলিন ফোর্থ বলেন, ‘আমরা দেখতে পারব কীভাবে আমাদের চৌম্বকীয় বুদ্বুদটি তার আকার পরিবর্তন করে এবং সূর্যের অগ্ন্যুৎপাতের সময় এটি কীভাবে সংকুচিত হয়।’ এ ছাড়া এর আলট্রাভায়োলেট ইমেজার উত্তর মেরুর অরোরা বা মেরুজ্যোতি টানা ৪৫ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।
মিশনটি বিজ্ঞানীদের আরও নির্ভুলভাবে ভূচৌম্বকীয় ঝড়ের পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করবে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মে মাসে একটি বড় সৌরঝড় বিশ্বব্যাপী জিপিএস ও রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত করেছিল। ১৯৮৯ সালে একই ধরনের ঝড়ে কানাডার কুইবেক প্রদেশে বিদ্যুৎ গ্রিড অচল হয়ে ৬ মিলিয়ন মানুষ ৯ ঘণ্টা অন্ধকারে ছিল।
১৮৫৯ সালের বিখ্যাত ‘ক্যারিংটন ইভেন্ট’-এর মতো শক্তিশালী সৌরঝড় যদি বর্তমানে আঘাত হানে, তবে তার ক্ষতির পরিমাণ হবে ট্রিলিয়ন ডলার। তবে স্মাইলের মতো মিশনের দেওয়া আগাম সতর্কতায় গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম বন্ধ রেখে সেই ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।