ণসংহতি আন্দোলন–জিএসএ প্রতি তিন মাস অন্তর বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং সেই তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে। দলটি বলছে, এতে বাজেট বাস্তবায়নের মান ও পরিমাণ নিশ্চিত হবে এবং সরকারের জবাবদিহি জোরদার হবে। আজ রোববার রাজধানীর হাতিরপুলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত ও মৌখিকভাবে বাজেট বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন দলের নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল। তিনি বলেন, ‘প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং তথ্য প্রকাশ করলে বাজেট বাস্তবায়নের কাজের মান ও পরিমাণ যথাযথ হবে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন দলের প্রধান সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) দেওয়ান আবদুর রশিদ নীলু। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জুলহাসনাইন বাবু। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন—দলের রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য মনির উদ্দিন পাপ্পু, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক বাচ্চু ভূঁইয়া, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পাদক দীপক কুমার রায়, দপ্তর সম্পাদক গোলাম মোস্তফা, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল বিষয়ক সম্পাদক তাহসিন মাহমুদ, কেন্দ্রীয় সদস্য মুন্নী মৃ, মনিরুল হুদা বাবন, আমজাদ হোসেন, লুভানা তাসনিম, জাতীয় পরিষদের সদস্য মুছা কলিমুল্লাহ, জামান কবীরসহ অন্যান্য নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত বিশ্লেষণে বলা হয়, ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট উপস্থাপন করেন, তা এসেছে এক ‘ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে।’ মোট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য সামনে রেখে ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, এটি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ের পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট।
একই সঙ্গে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বাজেটটি একটি রূপান্তরকালীন অর্থনৈতিক কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। গণসংহতির বিশ্লেষণে বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে মন্থর বিনিয়োগ এবং দুর্বল ব্যাংকিং খাতের মধ্যে বাজেটটি কাঠামোগত সংস্কার, বেসরকারি খাতের শিথিলকরণ এবং সামাজিক ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছে। তবে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাজেট বিশ্লেষণে বলা হয়, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশে নেমে আসে।
অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে ৯.৪২ শতাংশ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে মোট ব্যয়ের ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং পরিচালন ব্যয় কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।
দলটির বিশ্লেষণে বলা হয়, বাজেটে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির প্রায় ১০ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্য ৬ দশমিক ০৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। গণসংহতির বিশ্লেষণে বলা হয়, কর হার অপরিবর্তিত রেখে মূলত করের আওতা ও আদায়ের দক্ষতার ওপর নির্ভর করছে এই লক্ষ্য।
শিক্ষা খাত: বিশ্লেষণে বলা হয়, শিক্ষা খাতে বড় বরাদ্দ থাকলেও এর বড় অংশ বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যয় হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নে বরাদ্দ অপ্রতুল থেকে যাচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা: সামাজিক নিরাপত্তা খাতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দকে ইতিবাচক বলা হলেও রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
কৃষি: কৃষি খাতে ভর্তুকিনির্ভর বরাদ্দকে ‘সুরক্ষামূলক’ বলা হলেও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, গবেষণা, কোল্ড-চেইন ও বিপণন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিনিয়োগের ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়।
অবকাঠামো ও পরিবহন: বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ধারাবাহিকতা থাকলেও স্বাস্থ্য ও পরিবেশ খাতে তুলনামূলক কম বরাদ্দ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অর্থ আটকে থাকার ঝুঁকি তুলে ধরা হয়।
স্বাস্থ্য খাত: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম বলে উল্লেখ করা হয়। চিকিৎসা ব্যয় বাড়ায় সাধারণ মানুষ দারিদ্র্যঝুঁকিতে পড়ছে বলেও মন্তব্য করা হয়।
প্রতি বছর বাজেট বাস্তবায়নে প্রথম ৯ মাসে ধীরগতি এবং শেষ তিন মাসে তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের কাজের প্রবণতাকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয় গণসংহতির বিশ্লেষণে। এ কারণে তিন মাস অন্তর বাজেট বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রকাশের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে দলটি।
বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৪৩ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে ১ দশমিক ১২ ট্রিলিয়ন টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে ‘ক্রাউডিং-আউট’ প্রভাব তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয় দলটির পক্ষ থেকে।
গণসংহতি আন্দোলন বলেছে, বাজেটটি একদিকে ভোক্তা পর্যায়ে স্বস্তি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি ও স্টার্টআপ খাতে সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে রাজস্ব আহরণ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং এডিপি বাস্তবায়নের ওপর।
দলটি আরও বলেছে, খাদ্য বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা, ব্যাংক খাত সুরক্ষা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নারী উন্নয়ন, পরিবেশ, সৃজনশীল অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগকে ইতিবাচক বলা হলেও এগুলোর বাস্তবায়নে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য বলে মন্তব্য করা হয়।