কূটনৈতিক নিয়ম অনুসরণ করে আগে থেকে জানিয়ে যাওয়ার পরও ভারতের একটি বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টা হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ডা. জাহেদ উর রহমান। রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক সরকারের মর্যাদা রক্ষায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে নিজে থেকেই দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শেখ হাসিনা ও তাঁর নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের বাংলাদেশন নীতিরও সমালোচনা করতেন ডা. জাহেদ। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগের অংশ ছিলেন এই রাজনীতি বিশ্লেষক। তারেক রহমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসার পর থেকে তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষেই কথা বলছেন।
এক সপ্তাহ আগে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ বলেছিলেন, বাংলাদেশকে চাপে ফেলার জন্য ভারত এমনটি করছে বলে তিনি মনে করেন না; বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ হিসেবে এমনটি করা হচ্ছে। তবে তাঁর ওই বক্তব্য ও অবস্থানের সমালোচনা হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। এর এক সপ্তাহের মধ্যেই গত রোববার ভারতের কাছ থেকে দুর্ব্যবহারের শিকার হলেও বিষয়টিকে সুরাহা করার পূর্ণ দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এলে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টার দিল্লি অভিজ্ঞতা জানতে নানা প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা।
কী ঘটেছিল? এমন এক প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার মিডিয়াতে যা যা দেখছেন, ঘটনাগুলো এই রকমই ঘটেছে। আমি ব্যক্তি হিসেবে যাইনি, রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে গেছি। ফলে আমার সাথে যা হয়েছে, আমার মনে হলো তাৎক্ষণিক একটা প্রতিবাদ করা দরকার। সে জন্য ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একপর্যায়ে তাঁরা খুব চেষ্টা করেছেন যেন আমি ভারতে প্রবেশ করি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে একটা সিগনেচার থাকা দরকার। সেই কারণে আমি পাসপোর্টে সিল লাগাতে দিইনি। পাসপোর্টে ইমিগ্রেশনের সিল বসালে আমার দেশে ফেরাটা সহজ হতো। কিন্তু আমি তা না করে শ্রীলঙ্কা হয়ে ঘুরে এসেছি। আমি ডিসাইড করেছি যে এই সিলটা এবার নেব না।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘এর মাধ্যমে পাল্টাপাল্টি কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। এই বার্তাটা আমি দিতে চেয়েছি যে এটা শেখ হাসিনার সরকার না। এটা জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া একটা সরকার। কেবল ভারত নয়, অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে খুব খারাপ কোনো পরিস্থিতি হোক, সেটা আমরা চাই না। এটা সম্পর্কে চাপ তৈরি করা উচিত নয়। একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমরা একটা পদক্ষেপ নিয়েছি। এখন যা যা করণীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করবে। আশা করব ভবিষ্যৎ এনগেজমেন্টের ক্ষেত্রে এটা কোনো প্রভাব পড়বে না। প্রতিবেশী বদলানো যায় না। এ কথা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রেও সত্য। তাদের সরকার ব্যাপারটা বুঝবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। এই ঘটনায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে নিয়ে যাবে বলে আমি মনে করি না।’
কূটনৈতিক পাসপোর্ট না থাকার কারণেই এমন পরিস্থিতি হয়েছিল বলে বাজারে প্রচারণা রয়েছে। তবে বিষয়টি মোটেও সে রকম নয় বলে দাবি করেছেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘নিচ্ছি-নেব করতে করতে কূটনৈতিক পাসপোর্ট আমার নেওয়াই হয়নি। কূটনৈতিক পাসপোর্ট কোনো কারণ নয়, আমার পাসপোর্টে সার্ক স্টিকার দেওয়া হয়েছে। আমি যদি কূটনৈতিক পাসপোর্ট না-ও নেই, আমার কি বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ হবে? কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, পাসপোর্ট কারণ ছিল। কিন্তু এটা কোনো কারণ ছিল না। আমি যে ওখানে যাব, এই তথ্য জানানো হয়েছিল। আমাকে নিয়ে যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে, সেই সমস্যা তারা সমাধান করুক অথবা অবজেকশন থাকলে আগে দেওয়া ভালো হতো। আমাকে দেরি করানো হয়েছে, যেভাবে রাখা হয়েছে, বসানো হয়েছে, সেটা আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি।’
ইমিগ্রেশনে কী হয়েছিল? এমন প্রশ্নের উত্তরে ডা. জাহেদ বলেন, ‘আমার সঙ্গে আরও মানুষজন ছিলেন। তাঁরা তাঁদের ইমিগ্রেশন পার হয়ে গেলেন। আমার ইমিগ্রেশন যখন শুরু হলো তখন আমি মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম যে তাঁরা দেরি করছেন। আমাদের হাইকমিশনার প্রথম থেকেই আমার সঙ্গে ছিলেন। হাইকমিশনারের দুর্বলতার কথাও বলা হয়। আমি স্পষ্টভাবে বলছি, আমি ল্যান্ড করার পর থেকে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরার আগপর্যন্ত আমার সঙ্গে ছিলেন। দুই ঘণ্টার মাথায় আমি ডিসাইড করেছি যে ইটস টু মাচ! আমি আর ঢুকব না। যেহেতু এই রাষ্ট্রের একটা পদে আছি। সেই পদের প্রতি যে সৌজন্যতার ঘাটতি দেখিয়েছে, সেটার প্রতিবাদ করা উচিত বলে মনে করেছি। যখন আমি পাসপোর্ট ফেরত চাইলাম, তখন তাঁদের দিক থেকে খুবই আন্তরিকতাপূর্ণভাবে তাঁরা রিকোয়েস্ট করেছেন। কিন্তু আমার মনে হলো যা ঘটেছে, একটা প্রতিবাদ থাকার দরকার আছে। আমি ম্যালট্রিটেড হয়েছি। আমার সঙ্গে সঠিক বিহেভ করা হয়নি।’
বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে খবর বেরোলেও তা নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাকে খুব বেশি জিজ্ঞেসাবাদ করা হয়নি। বিষয়টি ডিল করছিলেন হাইকমিশনার। আমাকে এমন এক জায়গায় বসতে দেওয়া হয়েছে, সেটা রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমার জন্য সুইটেবল ছিল না। খুব বেশি কিছু জানারও সুযোগ ছিল না। প্রচুর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে ব্যাপারটা এ রকমও ছিল না। কোনো একটা রুমে নিয়ে আটকে রাখা হয়েছে বলে নানা কথাবার্তা ছড়াচ্ছে। এটা একদম নয়।’
আবার ভারতে যাবেন কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘নিশ্চয়ই যাব। যদি প্রপার ইনভাইটেশন পাই, আমি নিশ্চয় যাব। আমি ভারতের সঙ্গে এনগেজ করতে চাই, লজিক্যালি ও রেশনালি। এই এনগেজমেন্টের কথা বললে কারও কারও কাছে মনে হয় আমি দেশ বিকিয়ে দিতে যাচ্ছি। বাংলাদেশ বিকিয়ে দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এই সরকার কখনো করবে না। ভারতের সঙ্গে আমরা সমমর্যাদার ভিত্তিতে ব্যবসা বাণিজ্যসহ সব দিকে যুক্ত হতে চাই। গঙ্গা পানি চুক্তি, তিস্তা চুক্তি নিয়ে কথা আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারা বারবারই বলেছে যে, গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে তারা কাজ করবে। আমি আশা করি, তারা এগিয়ে আসবে। এবং সেখানে আমি যদি কোনো অবদান রাখার সুযোগ পাই নিশ্চয় করব। ’
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহল থেকে ভারতবিরোধিতার কারণে এমনটি হলো কি না? প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি জানি না। কারণ, এমন কিছু আমাকে বলা হয় নাই। আমি শেখ হাসিনার রেজিমের সমালোচনা করেছি। যদি কোনো যৌক্তিক কারণে ভারত সেই আলোচনায় আসে, তাহলে তা করা উচিত। কোনো রাষ্ট্রের প্রতি মারাত্মক আপত্তিকর কোনো মন্তব্য করিনি। এখন যারা অ্যাকটিভিজম করেন, তাঁরাও এটা করবেন বলে মনে করি।’