হোম > জীবনধারা > ফ্যাশন

রাশিফলে ভরসা করছে জেন-জি, পরছে রাশিচক্রের গয়নাও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

প্যারিসের বিলাসবহুল জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলস রাশিচক্রের গয়না বানাতে শুরু করে ১৯০৬ সালে। ছবি: মিলামোর ও ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলস

মিথুন? বৃশ্চিক? নাকি ধনু? কোন রাশি আপনার?

রাশি জানতে চাইলে আমরা ভাবনায় পড়লেও জেন-জি প্রজন্মের কাছে কিন্তু এটি মোটেও অবাক করার বিষয় নয়। জেন-জি তরুণ-তরুণীরা জ্যোতিষবিদ্যা বা নিজেদের রাশি জানতে বেশ আগ্রহীই বলা যায়। বরং তাদের কাছে নিজস্বতা প্রকাশের একটি মাধ্যম এই রাশি। অনেকের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের ‘বায়ো’ বা পরিচিতি অংশে রাশিচিহ্নও উল্লেখ করা থাকে। আত্মপরিচয় নিয়ে অতি সচেতন এই প্রজন্মের বড় একটি অংশের কাছে এই রাশিভিত্তিক পরিচয় এখন আভিজাত্য প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

সত্তরের দশকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল রাশিচিহ্ন খচিত এই গয়নাগুলো। ছবি: ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলস

পরামর্শক এবং ‘অ্যালাইভ ইন সোশ্যাল মিডিয়া’-এর লেখক লরেন্ট ফ্রাঁসোয়া বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বায়ো (পরিচয়) এবং কন্টেন্টে নিজেদের রাশি উল্লেখ করা এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলাই নয়, বরং নিজেকে সংজ্ঞায়িত করার একটি সহজ ও শক্তিশালী উপায় হিসেবে কাজ করছে।’

ফ্রাঁসোয়া আরও বলেন, রাশিফল এখন ‘ডিজিটাল সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

সব রাশির গয়না সমান বিক্রি হয় না; ব্যক্তিত্বভেদে আগ্রহ আলাদা। ছবি: মিলামোর

রাশিফল অ্যাপ ‘কো-স্টার’ থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে লাখেরও বেশি বার শেয়ার করা হয়েছে বলে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়াও টিকটকে ‘#উইচটক’ (#witchtok) কমিউনিটির উত্থানের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এই হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে আধ্যাত্মিকতা, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং রহস্যবাদ নিয়ে ইতিমধ্যে ৬০ লাখের বেশি ভিডিও তৈরি হয়েছে।

ডিজিটাল দুনিয়ার এই প্রবণতা এখন বাস্তব জগতেও প্রভাব ফেলছে। যার হাত ধরে গয়নার বাজারে ফিরে এসেছে রাশিচক্র বা ‘জোডিয়াক’ থিম।

চার পাতার ক্লোভার বা ‘আলহামব্রা’ নকশার জন্য বিখ্যাত প্যারিসের বিলাসবহুল জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলস। তবে এখন তাদের ‘জোডিয়াক’ কালেকশন বেশি নজর কাড়ছে। রাশিচক্রের ১২টি প্রতীকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি মেডেল, পেনডেন্ট এবং ব্রেসলেট এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ বছর নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এটি নতুনভাবে নকশা করে তুলনামূলক কম দামে বাজারে আনা হচ্ছে।

ভ্যান ক্লিফ অ্যান্ড আর্পেলস প্রথম রাশিচক্রের প্রতীক আঁকা শুরু করে ১৯০৬ সালে। পরে ১৯৫০-এর দশকে পূর্ণাঙ্গ জ্যোতিষভিত্তিক কালেকশন বাজারে আনে। সত্তরের দশকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিল রাশিচিহ্ন খচিত এই গয়নাগুলো। ২০২১ সালে ম্যালাকাইট, টারকোয়েজ এবং অবসিডিয়ানের মতো দামী পাথর দিয়ে তৈরি গয়নাগুলো পুনরায় বাজারে আনলে তা ব্যাপক সাড়া ফেলে। সে সময় একেকটি পিসের দাম ছিল প্রায় ২০ হাজার ৯০০ পাউন্ড বা ২৩ হাজার ৫০০ ডলার।

পাঁচ বছর পর আবারও নতুন রূপে বাজারে এসেছে জোডিয়াক সাইন কালেকশন। নতুন সংস্করণে প্রতিষ্ঠানটি হলুদ ও সাদা সোনার মেডেলিয়ন হিসেবে ব্রেসলেট ও নেকলেস নিয়ে এসেছে, যা নারী-পুরুষ উভয়ই পরতে পারবেন। এগুলোর দাম শুরু হচ্ছে ২ হাজার ২৯০ পাউন্ড বা ২ হাজার ৭৪০ ডলার থেকে।

এই উদ্যোগ গয়নায় রাশিচক্র মোটিফের প্রতি বাড়তে থাকা আকর্ষণকে সামনে আনে। বিলাসপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘মাইথেরেসা’-এর চিফ বায়িং অফিসার টিফানি সু জানান, তাদের গয়নার বিভাগে রাশিচক্র ও মহাকাশ থিমের নকশাগুলো বর্তমানে সেরা বিক্রির তালিকায় রয়েছে। এই গয়নাগুলো ক্লাসিক ও মার্জিত লুক বজায় রেখেও গ্রাহকদের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব প্রকাশের সুযোগ করে দেয় বলে মনে করেন তিনি।

টেকসই লাক্সারি ব্র্যান্ড ‘৮৮৬ বাই ব্রিটেনস রয়্যাল মিন্ট’-এর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ডমিনিক জোনসও একই ধরনের সাফল্যের কথা জানান। ২০২৪ সালে বাজারে আসা তাদের ‘জোডিয়াক’ সংগ্রহটি অল্প সময়েই দ্বিতীয় শীর্ষ বিক্রিত পণ্যে পরিণত হয়েছে। একইভাবে ফরাসি জুয়েলারি হাউস ‘গুসেনস’-এর ২০২০ সালে শুরু করা ‘অ্যাস্ট্রো’ কালেকশনটি ইউরোপ ও এশিয়ায় তাদের শীর্ষ পাঁচটি নকশার মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের মধ্যে মেলবন্ধন এই জোডিয়াক থিম গয়না

সোশ্যাল মিডিয়া কনসালটেন্ট লরেন্ট ফ্রাঁসোয়ার মতে, রাশিচক্রের গয়নার এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা আসলে জ্যোতিষশাস্ত্র ও প্রতীকের প্রতি তরুণ প্রজন্মের, বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের গভীর আগ্রহেরই প্রতিফলন। মিলেনিয়াল এবং জেন-জি প্রজন্মের গয়না ডিজাইনাররাও এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাশিচক্র থিমের গয়নার ভাণ্ডার আরও বড় করছেন।

জাপানে বেড়ে ওঠা জর্জ ইনাকি নিউ ইয়র্কভিত্তিক জুয়েলারি ব্র্যান্ড ‘মিলামোর’-এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর কাজে স্পেনীয় ও ফিলিপিনো ঐতিহ্যের প্রভাব দেখা যায়। ইনাকি জানান, তিনি জাপানে থাকতেই রাশিফল ও ভাগ্যগণনার জনপ্রিয়তা দেখে অভ্যস্ত ছিলেন, তবে পশ্চিমে এর ব্যাপকতা তাঁকে বিস্মিত করেছে।

তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর মানুষ প্রায়ই আমার রাশি জানতে চাইত। অনেক সময় মন্তব্য করত, ‘তুমি মনে হয় তুলা রাশি’ কিংবা ‘সে তো নিশ্চিত বৃশ্চিক রাশির’।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই ২০১৯ সালে মিলামোর ব্র্যান্ডটি চালুর পরপরই এতে রাশিচক্রের থিম যুক্ত করেন বলে জানান ইনাকি।

মিলামোরের মূল ব্যবসা জাপানি শিল্পকলা ‘কিনৎসুগি’ সংগ্রহ হলেও রাশিচক্রভিত্তিক গয়নাও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। কিনৎসুগি জাপানি ঐতিহ্য অনুযায়ী সোনা দিয়ে ভাঙা সিরামিক জোড়া লাগানোর শিল্প থেকে অনুপ্রাণিত।

রাশিচক্রের গয়না নিজেকে আলাদা করে চেনার একটি ব্যক্তিগত প্রতীক। ছবি: সংগৃহীত

ইনাকির মতে, সব রাশির গয়না সমান বিক্রি হয় না; ব্যক্তিত্বভেদে আগ্রহ আলাদা। তবে বিশেষ করে মীন, কন্যা, মিথুন, তুলা ও বৃশ্চিক রাশির জাতকদের মধ্যে এসব গয়নার প্রতি ঝোঁক বেশি দেখা যায়।

বিশ্বজুড়েই রাশিচিহ্ন জনপ্রিয়, এবার গয়নাও

বৈরুতভিত্তিক চার প্রজন্মের জুয়েলারি কোম্পানি ‘এল’ অ্যাটেলিয়ার নাওবার’-এর ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তানিয়া নাওবার ও দিমা নাওবার জানান, রাশিচক্রের প্রতি এই আগ্রহ কেবল পশ্চিমেই সীমাবদ্ধ নয়।

তাঁরা বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়াতেও আমরা এর প্রবল আগ্রহ দেখতে পাই। লেবাননসহ আরব বিশ্বে রাশিচক্র ও এর প্রতীকী চিহ্নগুলো দৈনন্দিন সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত। মানুষ একে আত্মপরিচয় সুরক্ষা ও প্রজন্মগত ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে মনে করে।’

তাঁদের নকশায় রাশিচক্রের বাইরেও ধর্মীয় চিহ্ন বা বাক্য ব্যবহারও দেখা যায়। ‘আয়াতুল কুরসি’, ভার্জিন মেরি রিং, সমৃদ্ধির প্রতীক ডালিম, সুরক্ষার প্রতীক ‘হামসা হ্যান্ড’ বা ‘ইভিল আই’ এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে হাতির মোটিফও তুলে ধরেন তাঁরা।

গয়নার বাজারে ফিরে এসেছে রাশিচক্র বা ‘জোডিয়াক’ থিম। ছবি: সংগৃহীত

ভারতেও জ্যোতিষশাস্ত্র দেবতাদের পূজা ও আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারতীয় নকশাকার সব্যসাচীর গয়না সংগ্রহে ‘আর্য রিং’-এর মতো বিশেষ নকশা রয়েছে। ১৮ ক্যারেট সোনা ও হীরা দিয়ে তৈরি এই আংটিতে ৯টি রঙিন রত্ন ব্যবহার করা হয়েছে, যা বৈদিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ‘নবরত্ন’ থেকে অনুপ্রাণিত। সংস্কৃতে নবরত্ন মানে ‘নয় রত্ন’, এবং বৈদিক জ্যোতিষে প্রতিটি রত্নের আলাদা শক্তি রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।

বৈদিক জ্যোতিষে রত্ন শুধু প্রতীক নয়, বরং পরিধানকারীর শক্তির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে বলে মনে করেন লন্ডনভিত্তিক জুয়েলারি ডিজাইনার কারিনা চৌধুরী। তাঁর নকশায় বৈদিক দর্শনের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কারিনার তৈরি ‘রিফ্লেকশনস লকেট’ বা ‘মেসেজ ইন এ বোটল’ গয়নাগুলোতে চুনি বা হীরা এমনভাবে বসানো থাকে যেন পাথরটি সবসময় পরিধানকারীর ত্বক স্পর্শ করে হৃদয়ের কাছাকাছি থাকে। আর বাইরের অংশটি অন্যদের চোখে পড়ে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যান্টিক জুয়েলারি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এভোক্যাট্রিস-এর প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টিন চেং জানান, গ্রাহকদের মধ্যে পশ্চিমা ও চীনা উভয় ধরনের রাশিচক্রের গয়নার চাহিদা বাড়ছে। গত বছর চীনা রাশিচক্র ‘সাপ’ গ্রাহকদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি করেছিল। এখন চেং এ বছরের চীনা রাশি ‘ফায়ার হর্স’ বা অগ্নিঘোড়া সম্বলিত গয়না সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

চেং-এর মতে, রাশিচক্রের গয়নার এই ফিরে আসা কেবল আধ্যাত্মিকতা বা আত্মপরিচয় নয়, বরং ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আলাদা করে চেনার একটি ব্যক্তিগত প্রতীক।

তিনি বলেন, ‘সবার তো আর পারিবারিক আভিজাত্যের সিলমোহর (ফ্যামিলি ক্রেস্ট) থাকে না, কিন্তু সবার একটি জন্মদিন থাকে, আর সেই সূত্রে থাকে একটি রাশি।’

এই ঈদে যেমন পোশাক বেছে নিতে পারেন

শাড়ির সঙ্গে হিজাব স্টাইলিং করবেন যেভাবে

গরমে কুল লুক দেবে ‘নেকড়ে’ হেয়ার কাট

ঈদের কেনাকাটায় থাকুক ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেল

‘সুতোর গল্প’ ছিল দেশজ পণ্য়ের উৎসব

এবারের ঈদের আয়োজনে ফ্যাশন ব্র‍্যান্ডগুলো যেমন পোশাক এনেছে

রমজানে পোশাকে থাকুক আভিজাত্য, স্বাচ্ছন্দ্য ও আধুনিকতা

ইফতারের দাওয়াতে কেমন পোশাক পরবেন

‘বস লেডি’র পোশাকে থাকুক আত্মবিশ্বাস ও আভিজাত্য

ডান হাতে ঘড়ি: শুধুই ফ্যাশন, নাকি রয়েছে বিশেষ কোনো কারণ