এম এস হোসেনের বেড়ে ওঠা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার মফস্বল পরিবেশে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। লামার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে পা রাখেন কর্মজীবনে। দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় তিনি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, এলএনজি ও ম্যানুফ্যাকচারিংসহ বিভিন্ন শিল্প খাতে কাজ করেছেন। কর্মজীবনের একপর্যায়ে তিনি নতুন প্রযুক্তি ও আধুনিক কাজের পদ্ধতি গভীরভাবে জানতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকে বেছে নেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইনভিস্টা নামের একটি কেমিক্যাল প্ল্যান্টে রিলায়াবিলিটি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে কর্মরত। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ড. মশিউর রহমান।
আপনার ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল কীভাবে?
স্নাতক শেষ করে সবার মতোই প্রথম লক্ষ্য ছিল একটি চাকরি পাওয়া। বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করার পর এনার্জি সেক্টরে কাজ শুরু করি। শুরুতে বুঝিনি, এই খাতটি কতটা চাহিদাসম্পন্ন ও বাস্তবমুখী। বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলত তত্ত্ব শিখি, কিন্তু শিল্প খাতে এসে দেখি—সমস্যা, ডেডলাইন, নিরাপত্তা, যন্ত্রপাতি ও মানুষের সমন্বয়ে কাজ করতে হয়। ধীরে ধীরে বুঝেছি, টেকনিক্যাল জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ ছাড়া জ্ঞানের মূল্য কমে যায়। আমার ক্যারিয়ারের ভিত্তি গড়ে উঠেছে ‘কাজ করতে করতেই শেখা’ এই নীতির ওপর। শুরুটা কঠিন হলেও সেটাই মানুষকে সবচেয়ে বেশি গড়ে তোলে।
প্রথম চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখেছেন?
প্রথম চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছি, বাস্তবে কর্মজীবন বইয়ের নিয়মে চলে না। আমি ভেবেছিলাম, অফিস মানে নির্দিষ্ট সময়, কিছু নিয়ম আর মিটিং। কিন্তু বাস্তবে দেখেছি, কর্মক্ষেত্রে বিশেষ করে এনার্জি খাতে কাজ মানে অনেক স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সমন্বয়। ঠিকঠাক কাজ না করলে শুধু টিম নয়, অন্য শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এখান থেকে তিনটি শিক্ষা শিখেছি—দায়িত্ববোধ, দলগত কাজ এবং চাপ সামলানোর দক্ষতা। আমি বুঝেছি, ‘আমি জানি’ বলার চেয়ে ‘আমি শিখব’ বলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রথম চাকরির আসল অর্জন বেতন নয়, বরং বাস্তবতা বোঝা এবং দ্রুত শেখার ক্ষমতা তৈরি করা।
আপনার মতে দক্ষতা কীভাবে গড়ে ওঠে?
নিজেকে সব সময় ‘কন্টিনিউয়াস লার্নার’ মনে করি। আমি মনে করি, দক্ষতা এক দিনে তৈরি হয় না; এটি চলমান প্রক্রিয়া। শুধু নিজের ইন্ডাস্ট্রি জানলেই হবে না; পাশাপাশি অন্য ক্ষেত্র সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। তাই এনার্জির পাশাপাশি ম্যানুফ্যাকচারিং, কনস্ট্রাকশনসহ বিভিন্ন খাত সম্পর্কে শিখেছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে নতুন সিস্টেম, টুলস, অটোমেশন, এমনকি নতুন চিন্তার ধরনও শিখতে হয়েছে। আমার কৌশল খুব পরিষ্কার, প্রথমে নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা, পরে সেটি উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা করা। অনেকে বলে ‘সময় পাই না’, কিন্তু আমি মনে করি, পরিকল্পনা ছাড়া সময় কখনোই পাওয়া যায় না। আপনি যদি জানেন আগামী তিন বছরে কোথায় যেতে চান, তাহলে আজ থেকে সেই অনুযায়ী নিজের স্কিল সেট গড়ে তুলতে হবে। কাজের বাইরে শেখা, বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ—এসবই দক্ষতা তৈরির অংশ।
ক্যারিয়ারে পরিবর্তনকে সময়মতো গ্রহণ না করলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়?
ক্যারিয়ারে পরিবর্তনকে দেরিতে গ্রহণ করার ঝুঁকি অনেক। প্রযুক্তি, কাজের ধরন, নেতৃত্ব—সবকিছু বদলাচ্ছে। আপনি যদি গতকালের যুক্তি দিয়ে আজকের সমস্যা সমাধান করতে চান, তাহলে পিছিয়ে পড়বেন। তাই আমি শিখেছি, নিজের সীমাবদ্ধতা অস্বীকার না করে দ্রুত চিনে নিতে হয়। ভুল মানে ব্যর্থতা নয়; ভুল হচ্ছে ফিডব্যাক, যদি আপনি সেটা বিশ্লেষণ করতে পারেন।
করপোরেট জীবনে সফলতা পেতে কীভাবেএগোনো উচিত?
আমার কাছে করপোরেট মাইন্ডসেটের মূল কথা তিনটি—দায়িত্ববোধ, সমস্যাকে সুযোগ হিসেবে দেখা এবং পেশাদারত্ব। অনেকে কর্মজীবনে ঢুকে শুধু কাজের বর্ণনা দেখে; কিন্তু বাস্তবে আপনার মূল্য নির্ধারিত হয় আপনি সমস্যা কীভাবে সামলান, পরিবর্তনকে কীভাবে গ্রহণ করেন এবং অন্যদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করেন, তার ওপর। আমি সব সময় বলি, অপরিবর্তনশীল মানসিকতা নিয়ে করপোরেট জগতে বেশি দূর এগোনো কঠিন। এখানে প্রতিদিনই নতুন কিছু আসে, নতুন টুল, নতুন চাহিদা, নতুন টিম কাঠামো। আপনি যদি এসবকে বাধা মনে করেন, তাহলে থেমে যাবেন। আর যদি প্রয়োজন ও চাহিদা বুঝে পরিকল্পনা করেন, তাহলে একই পরিস্থিতি আপনার বিকাশের সুযোগ হয়ে উঠবে। পেশাদারত্ব মানে শুধু ভদ্র ভাষা নয়; সময়মতো কাজ করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, যোগাযোগে স্পষ্টতা এবং নিজের কাজের প্রভাব বোঝা। করপোরেট জীবনে মানুষ শুধু আপনার দক্ষতা দেখে না; তারা দেখে আপনি চাপের মধ্যে কেমন আচরণ করেন। সেখানেই আপনার মানসিকতা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ পায়।
নেতৃত্বে আসার পর সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী পেয়েছেন?
নেতৃত্বে এসে আমি সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো—নেতৃত্ব মানে কর্তৃত্ব নয়; বরং প্রভাব সৃষ্টি করা। আমার কাছে নেতৃত্বের অর্থ ‘লিড বাই এক্সাম্পল’। আপনি যদি নিজে সামনে থেকে দায়িত্ব না নেন, কঠিন সময়ে টিমের পাশে না দাঁড়ান, তবে শুধু নির্দেশ দিয়ে কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়। আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা ছিল একটি বড় শাটডাউন অপারেশন পরিচালনা করা। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ, গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ সামলাতে হয়েছিল। তখন উপলব্ধি করেছি; পরিকল্পনা, সমন্বয়, নিরাপত্তা ও যোগাযোগ—এই চার বিষয় একসঙ্গে কাজ না করলে নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়। আরেকটি বড় শিক্ষা হলো, টিমকে জানতে হয়। মানুষকে না বুঝে তাদের দিয়ে সেরা কাজ আদায় করা যায় না। কে কী পারে, কার সীমাবদ্ধতা কোথায়, কার কী দুশ্চিন্তা—এসব জানা জরুরি। টিমের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হয়। যখন মানুষ বুঝতে পারে আপনি শুধু ফল চান না, তাদের উন্নয়নও চান; তখনই প্রকৃত নেতৃত্বের শুরু হয়।
আন্তর্জাতিক বা বহু সাংস্কৃতিক পরিবেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা আপনাকে কী শিখিয়েছে?
আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করে আমি বুঝেছি, আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার মানে শুধু বিদেশে চাকরি পাওয়া নয়; বরং নিজের সীমানার বাইরে চিন্তা করতে শেখা এবং অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করা। বাংলাদেশে কাজ করার সময়ও বহুজাতিক পরিবেশের অভিজ্ঞতা ছিল, তবে যুক্তরাষ্ট্রে এসে ভিন্ন সংস্কৃতিকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি। এখানে সময়ানুবর্তিতা, সময় ব্যবস্থাপনা, সহানুভূতি এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা—এসব শুধু ভালো গুণ নয়; কাজের অপরিহার্য অংশ। আপনি যদি অন্যের সংস্কৃতি না বোঝেন, তাহলে অনিচ্ছাকৃতভাবেও ভুল বার্তা দিতে পারেন। তাই আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করতে চাইলে শুধু ইংরেজি জানলেই হবে না; প্রয়োজন সাংস্কৃতিক বোধ। মানুষ কীভাবে মতামত দেয়, মিটিং পরিচালনা করে, মতভেদ সমাধান করে—এসব বোঝা জরুরি।
আমার কাছে গ্লোবাল মাইন্ডসেট মানে নিজের শিকড় ধরে রেখে বিশ্বের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষার্থীরা কী করলে ভবিষ্যৎ করপোরেট বা গ্লোবাল ক্যারিয়ারের জন্য প্রস্তুত হতে পারবে?
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের সময় হিসেবে দেখি না; এটি নিজেকে প্রস্তুত করার সময়। প্রথমত, কৌতূহলী হতে হবে। শুধু সিলেবাস শেষ করলেই হবে না, ইন্ডাস্ট্রিতে কী পরিবর্তন আসছে, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, কী ধরনের টুল ব্যবহৃত হচ্ছে—এসব সম্পর্কে জানতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিজের বিভাগের বাইরে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। ভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করা, প্রকল্পে অংশ নেওয়া, সহযোগিতামূলক কাজ করা—এসব বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি, অনলাইন কোর্স ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে। এখন নিজ দেশে বসে আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একজন মেন্টর খুঁজে নেওয়া এবং যোগাযোগ দক্ষতা বাড়ানো। পাশাপাশি লিংকডইন, পেশাজীবী সংগঠন ও অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করতে হবে। আমি সব সময় বলি, নিখুঁত পরিস্থিতির অপেক্ষা না করে নিজের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে।
ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে কী ধরনের দক্ষতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রে অটোমেশন, ডেটা অ্যানালাইসিস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিমোট অপারেশন এবং ডিজিটাল সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এসব বড় প্রভাব ফেলবে। আগে যেসব কাজ পুরোপুরি হাতে-কলমে হতো, এখন সেগুলো ধীরে ধীরে তথ্যনির্ভর হয়ে উঠছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে; বরং মানুষের কাজের ধরন বদলাবে। বর্তমানে সেই মানুষই বেশি মূল্যবান, যিনি তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন, সমস্যা সমাধান করতে পারেন, প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করতে পারেন এবং বিভিন্ন টিমের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেন। তাই শুধু কারিগরি দক্ষতা নয়; বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনা, অভিযোজন ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং আজীবন শেখার মানসিকতা—এসব সমান গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের বলব, নিজের ক্যারিয়ারের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করুন এবং সেই অনুযায়ী গভীর দক্ষতা অর্জন করুন। সবকিছু শেখার চেষ্টা না করে, প্রাসঙ্গিক বিষয়ে দক্ষতা বাড়ানোই বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশি তরুণদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?
বাংলাদেশি তরুণদের বলব, নিজেকে সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখবেন না, আবার সাফল্যের শর্টকাটের পেছনেও ছুটবেন না। প্রথমত, কৌতূহলী হন। অজানাকে জানার আগ্রহ না থাকলে প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করুন এবং তা উন্নয়নের পরিকল্পনা করুন। তৃতীয়ত, অভিযোগ কমিয়ে কাজে মনোযোগ দিন। সীমাবদ্ধতা থাকলেও সেটিকে অজুহাত বানানো যাবে না। চতুর্থত, সময়জ্ঞান, কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, আচরণ—সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা জরুরি। পঞ্চমত, মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখুন। পথপ্রদর্শক, সহকর্মী ও পেশাগত নেটওয়ার্ক—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলব, সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। ধীরে এগোন, কিন্তু থেমে যাবেন না। প্রতিদিন অল্প অল্প করে নিজেকে উন্নত করলে পাঁচ বছর পর আপনি এমন জায়গায় পৌঁছাবেন, যা আজ কল্পনাতেও আসছে না।