মুসলিম জাহানের হৃৎস্পন্দন পবিত্র কাবা শরিফ। প্রতিবছর নতুন হিজরি বছরের শুরুতে তথা ১ মহররমের রাতে কাবার গায়ে চড়ানো হয় এক নতুন গিলাফ, যা আরবিতে ‘কিসওয়াহ’ (الكسوة) নামে পরিচিত। মক্কার ‘কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর হোলি কাবার কিসওয়াহ’ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই পবিত্র গিলাফ তৈরি করে।
শত বছরের ঐতিহ্য আর আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি এই গিলাফ কেবল ইসলামের একটি পবিত্র প্রতীকই নয়, বরং এটি সমকালীন বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল ও শ্রেষ্ঠ একটি শিল্পকর্ম।
কাবার একটি গিলাফ তৈরি করতে প্রায় ১০ থেকে ১১ মাস সময় লাগে। এর পেছনে নিরলসভাবে কাজ করেন বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ১৫০ জন সৌদি দক্ষ শিল্পী ও কারিগর।
প্রস্তুতকরণের পর সম্পূর্ণ কিসওয়াহটির ওজন দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৪১৫ কেজি। এটি মূলত দুটি স্তরে বিভক্ত:
কিসওয়াহ তৈরিতে প্রাকৃতিক রেশমের ৪৭টি রোল ব্যবহার করা হয়, যা বিশেষ প্যানেলে বুনে কাবার পুরো বহিরাঙ্গনকে ঢেকে দেওয়া হয়। এই কাপড়ের সূক্ষ্মতা এত বেশি যে প্রতি মিটার নকশাদার কাপড়ে প্রায় ৯ হাজার ৯৮৬টি সুতা থাকে।
কিসওয়াহর অন্যতম প্রধান সৌন্দর্য হলো এর গায়ে ‘জালি ছুলুছ’ লিপিতে খোদাই করা পবিত্র কোরআনের আয়াত ও ইসলামিক নকশা। নতুন গিলাফটিতে মোট ৩০টি কোরআনের আয়াত রয়েছে। এই রাজকীয় ক্যালিগ্রাফির জন্য যে পরিমাণ ধাতব সুতা ও উপাদান লাগে, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো—
একটি কিসওয়াহ চূড়ান্তভাবে কাবার গায়ে জড়ানোর আগে অত্যন্ত কঠোর নজরদারিতে সাতটি প্রধান ধাপ পার হয়ে আসে:
কিসওয়াহর বড় বড় প্যানেলগুলো জোড়া দেওয়ার জন্য একটি বিশেষায়িত সেলাই মেশিন ব্যবহার করা হয়, যাকে বিশ্বের দীর্ঘতম সেলাই মেশিন বলা হয়। কিসওয়াহর প্রতিটি রেশমি প্যানেল দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৪ মিটার এবং প্রস্থে ১ মিটার হয়ে থাকে। এই প্যানেলগুলোকে একদম সোজা লাইনে এবং নিখুঁতভাবে জোড়া দেওয়ার জন্য অত্যাধুনিক লেজার-গাইডেড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা সামান্যতম বিচ্যুতিও হতে দেয় না।
কাবার গায়ে কিসওয়াহটি সুন্দরভাবে ধরে রাখার জন্য এবং তীব্র ঝড়-বৃষ্টি কিংবা লাখ লাখ হাজিদের ভিড়েও যেন এটি স্থানচ্যুত না হয়, সে জন্য এটিকে প্রায় ১০০টি বিশেষ দড়ি বা রশি দিয়ে কাবার কাঠামোর সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে সুরক্ষিত করা হয়।
মক্কার উম্মুল জুদ এলাকায় অবস্থিত ‘কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স’ এই গিলাফ তৈরির মূল কেন্দ্র। তবে এর ইতিহাস শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে, ১৩৪৬ হিজরিতে। তৎকালীন সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ আল সাউদের নির্দেশে মক্কার আজইয়াদ এলাকায় প্রথম কিসওয়াহ তৈরির কারখানা ‘দারুল কিসওয়াহ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে এটি আধুনিকায়ন করে উম্মুল জুদে স্থানান্তর করা হয়। বিগত আট দশক ধরে সৌদি আরবের নিজস্ব কারিগরদের হাত ধরে এই ঐতিহ্য সংরক্ষিত হয়ে আসছে।
বাদশাহ আবদুল আজিজের পর থেকে বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ পর্যন্ত প্রতিটি সৌদি শাসকই এই কারখানার আধুনিকায়ন, উচ্চমানের কাঁচামাল সংগ্রহ এবং প্রযুক্তির উন্নয়নে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছেন।
কাকতালীয় কোনো বিষয় নয়, বরং সর্বোচ্চ ভক্তি ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতিবছর কেবল একটি কিসওয়াহ বা গিলাফ তৈরি করতে সৌদি সরকারের ব্যয় হয় ২৫ মিলিয়ন (২ কোটি ৫০ লাখ) সৌদি রিয়ালেরও বেশি।
-দ্য ইসলামিক ইনফরমেশন অবলম্বনে