মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি তেল ও গ্যাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও এই মরু অঞ্চলের মানুষের টিকে থাকার প্রধান ভিত্তি হলো পানি। কিন্তু চলমান ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অমূল্য সম্পদটিই এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর পানীয় জলের প্রধান উৎস ‘ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট’ বা সমুদ্রের পানিকে সুপেয় করার কারখানাগুলো এখন যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাসিন্দা সোফিয়া (ছদ্মনাম) জানান, নির্ঘুম রাতে তাঁর প্রধান দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে—যদি কল দিয়ে পানি আসা বন্ধ হয়ে যায়? তিনি বলেন, ‘আমরা তো মরুভূমিতেই বাস করছি। তেল-গ্যাস হয়তো অর্থনীতির প্রাণ, কিন্তু পানি আমাদের বেঁচে থাকার ভিত্তি। শত্রু যদি আঘাত করতে চায়, তবে আমাদের এই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের ওপরই আগে আঘাত করবে।’
৮ মার্চ (রোববার) বাহরাইন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি ইরানি ড্রোন তাদের একটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে আঘাত হেনেছে। যদিও এতে পানি সরবরাহ বিঘ্নিত হয়নি। এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কেশম দ্বীপের একটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে ৩০টি গ্রামের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘ইটের বদলে পাটকেল’ নীতি উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি মানুষের সুপেয় পানির নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো তাদের পানীয় জলের প্রায় পুরোটাই এই কৃত্রিম ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক ক্রিস্টোফার লো এই অঞ্চলকে ‘সল্টওয়াটার কিংডম’ বা লবণাক্ত পানির সাম্রাজ্য বলে অভিহিত করেছেন। তেল ও গ্যাসের টাকায় মরুভূমিতে আধুনিক শহর ও জীবনযাত্রা গড়ে উঠলেও এর নেপথ্যে রয়েছে ডিস্যালিনেশন প্রযুক্তি। কুয়েত ও ওমানে প্রায় ৯০ শতাংশ, বাহরাইনে ৮৫ শতাংশ ও সৌদি আরবে ৭০ শতাংশ পানির চাহিদা মেটানো হয় এই পদ্ধতিতে। দুবাই, আবুধাবি বা দোহার মতো শহরগুলো এখন পুরোপুরি এই প্ল্যান্টগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় বেসামরিক স্থাপনায় হামলা নিষিদ্ধ। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক লরেন্ট ল্যাম্বার্ট বলেন, যদি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে হামলা কোনো সামরিক নীতির অংশ হয়, তবে তা স্পষ্টত যুদ্ধাপরাধ। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে মাত্র কয়েক সপ্তাহের পানি মজুত থাকে। এই অবকাঠামো ধ্বংস হলে দেশগুলোর অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।
তবে বেসামরিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হলেও এর নজির রয়েছে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাক ইচ্ছা করে পারস্য উপসাগরে লাখ লাখ ব্যারেল তেল ঢেলে দিয়েছিল, যাতে ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলো অচল হয়ে পড়ে। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজায় ইসরায়েলি হামলায় পানি সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এ ছাড়া সরাসরি হামলা ছাড়াও সাইবার হামলা ও যুদ্ধের পরোক্ষ ক্ষয়ক্ষতিও একটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ। চলতি মাসের শুরুর দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের দুটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সাইবার হামলার মাধ্যমে এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। একটি আধুনিক ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুনরায় সচল করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।
যুদ্ধ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০১০ সালের সিআইএর এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল, উপসাগরীয় অঞ্চলে ডিস্যালিনেশন ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া অন্য যেকোনো খাতের ক্ষতির চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম আসার আগেই যদি এই পানিসংকটের সমাধান না হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে পরিকল্পিত হামলা হবে একটি ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার মতো ঘটনা, যা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের শামিল। এর ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক ও মানসিক ক্ষত হবে অকল্পনীয়।
উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক ক্রিস্টোফার লো বলেন, ‘এটি সত্যিই ভয়াবহ একটি কৌশল। এর রাজনৈতিক ও মানসিক ক্ষত এতটাই প্রবল হবে, যা আমি কল্পনাও করতে পারছি না।’
অবশ্য ইরান এখন পর্যন্ত পানি শোধনাগারগুলোর ওপর হামলা না চালিয়ে একধরনের সংযম প্রদর্শন করছে। তারা মূলত জ্বালানি অবকাঠামো ও মার্কিন রাডারগুলোতে আঘাত করে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে। তবে যুদ্ধের দামামা বাড়লে ইরান এই ‘ওয়াটার কার্ড’ ব্যবহার করতে পারে, যা পুরো অঞ্চলকে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেবে।
সিএনএন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত