ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে। এই সময়ে ইরানজুড়ে চালানো হামলায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। জবাবে, ইরান আরও পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। খবর আল জাজিরার।
ইরানের তাসনিম নিউজের তথ্যমতে, গতকাল বুধবার ইসরায়েলি হামলায় রাজধানী তেহরান, পবিত্র নগরী কোম, পশ্চিম ইরান এবং মধ্যাঞ্চলীয় ইসফাহান প্রদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বার্তা সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, এই হামলায় আবাসিক ভবনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) আধাসামরিক স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী ‘বাসিজ’–এর ভবন এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কমান্ডের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যৌথ অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪৫ জনে পৌঁছেছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি মোহাম্মদ ভল জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষ এই হামলার মূল শিকার হচ্ছে এবং দেশটি সব দিক থেকে আগুনের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে একটি নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই অভিযান চলছে যা কোনো অঞ্চল, শহর বা এলাকাকেই রেহাই দিচ্ছে না।’ তিনি যোগ করেন, ‘আমরা জানি যে ৩০০ শিশু ও কিশোরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে... এবং আহত হয়েছে ৬ হাজারেরও বেশি মানুষ।’
এদিকে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ইস্পাহান পরমাণু কেন্দ্রের কাছের দুটি ভবনে হামলার চিহ্ন দেখা গেছে। তবে পারমাণবিক উপাদান রয়েছে এমন কোনো স্থাপনার ক্ষতি হয়নি এবং তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো ঝুঁকি নেই।
অপরদিকে, দেশজুড়ে বিস্ফোরণের ঘটনায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইর জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, কৌশলগত সমস্যার কারণে এই বিলম্ব ঘটছে। বুধবার শেষ রাত থেকে শুরু হয়ে কয়েক দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠান চলার কথা ছিল। দাফন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি এখনো চলছে এবং এতে বিশাল জনসমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই শোক মিছিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার সম্ভাব্য হুমকি রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় প্রায় ১ কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিল।
শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার প্রথম তরঙ্গে খামেনি নিহত হন। সেই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদাহসহ আরও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হয়েছিলেন। জবাবে তেহরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। যদিও ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলো অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে, তবে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র সামরিক সম্পদ এবং বেসামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে। এছাড়া ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষও কিছু বেসামরিক এলাকায় পড়েছে।
খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি নির্বাচনের কাজ করছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় কট্টরপন্থী থেকে শুরু করে সংস্কারপন্থী—সব পক্ষই রয়েছে। অভিভাবক পরিষদ বা গার্ডিয়ান কাউন্সিল এবং বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য আয়াতুল্লাহ আহমদ খাতামি জানিয়েছেন, দেশ খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তিনি রাষ্ট্রীয় টিভিকে বলেন, ‘খুব দ্রুতই সর্বোচ্চ নেতাকে শনাক্ত করা হবে। আমরা সিদ্ধান্তের কাছাকাছি; তবে দেশের পরিস্থিতি এখন যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি।’
কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা না দিলেও ইসরায়েলি ও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, কট্টরপন্থী মুসলিম নেতা মোজতবা খামেনেই ৪৭ বছরের পুরনো এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে যিনিই মনোনীত হবেন, তাকেই হুমকি দিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ইরানের সন্ত্রাসী শাসনের মাধ্যমে নিযুক্ত প্রতিটি নেতা—যারা ইসরায়েল ধ্বংসের পরিকল্পনা অব্যাহত রাখবে, যুক্তরাষ্ট্র ও মুক্ত বিশ্ব এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোকে হুমকি দেবে এবং ইরানি জনগণকে দমন করবে—তাদের প্রত্যেককেই নির্মূল করা হবে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেছেন, তেহরানের নেতৃত্ব এখন বিপর্যস্ত। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখন খুব শক্তিশালী অবস্থানে আছি এবং তাদের নেতৃত্ব দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। যে-ই নেতা হতে চাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত সে মারা যাচ্ছে।’