দুই দশক আগে যে রোগটিকে পৃথিবী থেকে প্রায় নির্মূল ভাবা হয়েছিল, সেই ‘হাম’ এখন বিশ্বজুড়ে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ হামে প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের সিংহভাগই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। টিকার প্রাপ্যতা সত্ত্বেও টিকাদানে অনীহা এবং স্বাস্থ্য কাঠামোর দুর্বলতার কারণে এই মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালে হামকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মূল ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৪৬টি অঙ্গরাজ্যে ৩ হাজার ৫৬৪ জন হামে আক্রান্ত হয়েছেন। এটি গত ২৫ বছরের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব। দক্ষিণ ক্যারোলিনায় আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ (প্রায় ১০০০)। টেক্সাসে টিকা না নেওয়া দুই স্কুলপড়ুয়া শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা ২০১৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে হামে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।
কেন এই সংকট? টিকাদানে ঘাটতি ও অনীহা
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি এলাকায় হামের সংক্রমণ ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকাদান প্রয়োজন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই হার ২০১৯ সালের ৯৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৩ সালে ৯২ শতাংশে নেমে এসেছে। টেক্সাসের কিছু এলাকায় টিকাদানের হার মাত্র ৮২ শতাংশ। সাম্প্রতিক আক্রান্তদের ৯৩ শতাংশই হয় কোনো টিকা নেননি, অথবা তাদের টিকার রেকর্ড নেই। মাত্র ৪শতাংশ ক্ষেত্রে পূর্ণ ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের লক্ষণ ছিল খুবই সামান্য।
বাংলাদেশের চিত্র
হঠাৎ হামের সংক্রমণ বাড়ার কারণ সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু টিকা পায়, অর্থাৎ অন্তত ১০ শতাংশ শিশু বাইরে থেকে যায়। এই ‘মিসিং’ শিশু ধীরে ধীরে ঝুঁকিতে পড়ে এবং কয়েক বছর পর সংক্রমণ দেখা দেয়। আর দীর্ঘদিনের টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা এবং রোগ নজরদারির দুর্বলতার ফলে এখন এ সংক্রমণ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘অনেক শিশু ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০২০ সালে ক্যাম্পেইন চালিয়েছে; ২০২৪ সালে করার পরিকল্পনা থাকলেও তা হয়নি।’
হাম কেন ভয়ংকর?
হাম কেবল সাধারণ সর্দি-জ্বর নয়; এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি বায়ুবাহিত ভাইরাস। এটি ইনফ্লুয়েঞ্জা, কোভিড-১৯ এমনকি ইবোলা ভাইরাসের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হামের ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ অ্যান্টিবডি মুছে দিতে পারে। একে বলা হয় ‘ইমিউন অ্যামনেসিয়া’। এর ফলে শিশুটি পরবর্তীতে নিউমোনিয়া বা ফ্লুর মতো সাধারণ রোগেও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হতে পারে।
অন্যান্য জটিলতা
এসএসপিই: এটি একটি বিরল কিন্তু প্রাণঘাতী রোগ যা হাম হওয়ার অনেক বছর পর মস্তিষ্কে দেখা দেয়।
জীবনযাত্রা ও প্রতিরোধ
গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল ওষুধ দিয়ে রোগ নিরাময় নয়, বরং জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং সঠিক পুষ্টি রোগ প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার।
পুষ্টি: ভিটামিন এ-র অভাব হামের ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকেরা আক্রান্ত শিশুদের ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার পরামর্শ দেন।
ফাংশনাল ফিটনেস: দৈনন্দিন শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখলে শরীরের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
টিকাদান: এমএমআর টিকার দুটি ডোজ ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা নিশ্চিত করে। টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সামান্য জ্বর বা গায়ে ব্যথা হতে পারে, যা খুবই স্বাভাবিক। অটিজমের সঙ্গে টিকার কাল্পনিক সম্পর্কের দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে অনেক আগেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্বেগ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস বলেন, ‘হাম কোনো সীমানা মানে না। যখন একটি সম্প্রদায়ের প্রতিটি শিশু টিকা পাবে, তখনই আমরা এই রোগ নির্মূল করতে পারব।’ ২০২৪ সালে বিশ্বের ৮৪ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজ এবং ৭৬ শতাংশ শিশু টিকার উভয় ডোজ পেয়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩ কোটি শিশু প্রয়োজনীয় সুরক্ষার বাইরে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, যদি টিকাদানের হার পুনরায় বাড়ানো না যায়, তবে বিশ্বজুড়ে হামের আরও বড় ধরনের মহামারি ফিরে আসতে পারে। অভিভাবকদের প্রতি চিকিৎসকদের আহ্বান—সব ধরনের অপপ্রচারে কান না দিয়ে সময়মতো শিশুকে টিকার দুটি ডোজ সম্পন্ন করান।