দেশে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্রমে বেড়েই চলেছে। রোগটি উচ্চমাত্রায় সংক্রমণশীল। এ কারণে বর্তমান সংক্রমণপ্রবণতা আরও এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সংক্রমিত শিশুদের সঠিকভাবে বিচ্ছিন্ন রেখে (আইসোলেশন) চিকিৎসা দিলে এবং সুস্থ শিশুদের টিকার আওতায় আনা গেলে সংক্রমণের গতি কমতে এক-দেড় মাস বা তার কিছু বেশি সময় লেগে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে হাম শনাক্তের হার এ পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী। সরকারের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১২ হাজার সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ তথ্য ১৫ মার্চ থেকে পরবর্তী ২৪ দিনের। এর মধ্যে ২ হাজার ২৪১ জনের ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ১৮৭ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করা হয়, যার মধ্যে ৬৪২ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে।
সরকারিভাবে হামের প্রকোপ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয় মূলত ১৫ মার্চ থেকে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৪ দিনে মোট সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশের ক্ষেত্রে হাম নিশ্চিত হয়েছে। তবে গত এক দিনে সংক্রমণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ শতাংশে, যা সংক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম সন্দেহ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৪৩ জনের। নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ২৩ জনের। ফলে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৬ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ আজকের পত্রিকার সঙ্গে আলাপকালে বলেন, এ দেশে হামের সংক্রমণ সাধারণত শীতের শেষ থেকে বসন্তকাল—ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল এবং কখনো মে পর্যন্ত বেশি দেখা যায়। তবে উষ্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বছরের অন্য সময়ও এর সংক্রমণ ঘটতে পারে।
বে-নজির আহমেদ সতর্ক করে বলেন, ‘বর্তমানে সংক্রমণ যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে শনাক্ত হওয়া প্রতিটি রোগীর বাইরেও একই সময়ে আরও সংক্রমিত থাকতে পারে। তাদের লক্ষণ পরে প্রকাশ পাবে। ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ডের কারণে ধাপে ধাপে নতুন রোগী সামনে আসে। এ ছাড়া টিকাদান শুরু হলেও শিশুর শরীরে পূর্ণমাত্রায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে দুই থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে। ফলে সংক্রমণের এ ধারা আরও কিছু সময় চলতে পারে।’
বর্তমান সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ উদ্যোগে রোগতত্ত্ববিদেরা দুটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। এগুলো হচ্ছে আক্রান্তদের যথাযথ আইসোলেশন (বিচ্ছিন্নকরণ) এবং অন্যদের দ্রুত টিকাদান। একটি এলাকায় অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইমিউনিটি তৈরি হয় এবং ভাইরাসের সংক্রমণ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
চলতি বছর হামের সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর প্রথমে সবচেয়ে বেশি রোগী পায় রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। এই হাসপাতালেই রোগটিতে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান গতকাল আজকের পত্রিকাকে জানান, গত এক দিনে তাঁর হাসপাতালে নতুন করে ২১ জন হাম সন্দেহভাজন রোগী ভর্তি হয়েছে। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশেষায়িত সরকারি এ হাসপাতালটিতে মোট ৮০৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৬৩ জন। সম্ভাব্য হাম রোগে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. আরিফুল বাশার বলেন, দেশে হামের সংক্রমণ বৈশাখের পর ধীরে ধীরে কমে আসে। তবে এবারের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় মার্চ ও এপ্রিলজুড়ে সংক্রমণ অব্যাহত থাকতে পারে। টিকা নেওয়ার পর শরীরে কার্যকর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে সাধারণত প্রায় এক মাস সময় লাগে।
কোনো শিশু একবার হামে আক্রান্ত হলে পরবর্তী কিছুদিন তার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকতে পারে। ফলে অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে হাম থেকে সেরে ওঠা শিশুকে পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার পাশাপাশি বিশেষ যত্নে রাখার পরামর্শ দেন ডা. আরিফুল বাশার।
হামের প্রকোপ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। প্রথম ধাপে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় এ কার্যক্রম চলছে। যেখানে ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। সারা দেশে ৩ মে থেকে টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা এগিয়ে ২০ এপ্রিলে আনা হচ্ছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) সারা বছর শিশু ও নারীদের ১২টি রোগপ্রতিরোধে ১০টি টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে হাম ও রুবেলা রোগপ্রতিরোধে এমআর টিকাও অন্তর্ভুক্ত। নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমে ৯ থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের এমআর টিকা প্রদান করা হয়।