ভারতের এক জেনারেল বলেছেন, ইরান যদি পরাজিত হয়, তাহলে সেটিই হবে ভারতের সাফল্য—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া আলোচিত দাবিতে একটি ছবিও প্রচার করা হচ্ছে।
এই দাবিতে ফেসবুকে পোস্ট আছে এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
শেখ শাহরিয়ার কামাল ভূইয়া নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ১৪ মার্চ ভিডিওটি শেয়ার করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ‘ভারতের এক জেনারেল বলেছেন—যদি ইরান পরাজিত হয়, তাহলে সেটিই ভারতের সাফল্য হবে এবং এরপর ভারত তিন দিক থেকে পাকিস্তানকে ঘিরে ফেলতে পারবে। এ থেকে অনেকেই মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ভারতের সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে। এ থেকে অনেকেই মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’
৩১ সেকেন্ডের ভিডিওটি আজ (১৫ মার্চ) বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজারবার দেখা হয়েছে। ভিডিওটিতে প্রায় ১ হাজার ২০০টি রিঅ্যাকশন রয়েছে এবং ২৮২টি কমেন্ট করা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটি প্রায় এক হাজারবার শেয়ার করা হয়েছে। ভিডিওটির কমেন্ট যাচাই করে দেখা যায়, বেশির ভাগ ব্যবহারকারী ভিডিওটিকে সত্য মনে করে কমেন্ট করেছেন।
ACE of PAF নামের একটি পেজ থেকেও একই দাবিতে একটি ছবি শেয়ার করা হয়। পাকিস্তান থেকে পরিচালিত বলে দাবি করা ওই পেজের পোস্টের ক্যাপশনে আরবি ভাষায় ‘বিসমিল্লাহ’ লেখা, সঙ্গে পাকিস্তানের পতাকা এবং আড়াআড়ি দুটি তলোয়ারের আইকন। পোস্টটির কমেন্টেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
ভিডিওতে ভারতের সেনাবাহিনীর ইউনিফর্মের আদলে পোশাক পরা একজন ব্যক্তিকে ইংরেজিতে বলতে শোনা যায়—ইসরায়েল যদি ইরানকে কবজা করতে সফল হয়, তাহলে পাকিস্তানকে তিন দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। পূর্ব দিক থেকে ভারত এবং বাম দিক থেকে আফগান তালেবান ও ইসরায়েলপন্থী ইরান। অখণ্ড ভারত পুনরুদ্ধারের জন্য এটিই ভারতের পথ। বাংলাদেশ ও নেপালের হুমকির বিষয়টি পরে মোকাবিলা করা হবে।
ভিডিওটির ওপরের ডান কোণে লাল রঙের ‘PTI’ লেখা দেখা যায়। এই লোগো ধরে অনুসন্ধানে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা Press Trust of India (PTI)-এর ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্টে গত বছরের ৪ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। এটির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওটির মিল রয়েছে। ওই পোস্ট থেকে জানা যায়, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির নাম সি এস মান। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর আর্মি ডিজাইন ব্যুরোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি)।
পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়েছে, মেজর জেনারেল সি এস মান বলেছেন, সামরিক খাতের কোনো সরঞ্জাম বা উপাদানে চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হবে না। বিশেষ করে ড্রোন সিস্টেমের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি বা দুর্বলতা যাতে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি ও প্রোটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে।
পিটিআইয়ের ওই বক্তব্যের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর বক্তব্যের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। তবে ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড, চেয়ারের রং, জেনারেল সি এস মানের পোশাক এবং ভিডিওতে থাকা পিটিআইয়ের লোগোর হুবহু মিল রয়েছে। এ ছাড়া কথা বলার সময় সি এস মানের চোখের নড়াচড়া ও ঠোঁটের ওঠানামারও মিল পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে ভারতীয় গণমাধ্যম Moneycontrol-এর ওয়েবসাইটে ‘Army Design Bureau bans use of Chinese parts in Indian military components’ শিরোনামে গত বছরের ৪ জুলাই প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে এবং তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের সামরিক প্রযুক্তিতে চীনে তৈরি হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যারের ব্যবহার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মূলত ‘গ্রে জোন’ যুদ্ধ বা সাইবার হুমকি মোকাবিলার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবি এবং পিটিআইয়ের ভিডিওর সঙ্গে বিষয়টির মিল পাওয়া যায়।
আরও অনুসন্ধানে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ফ্যাক্টচেক নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্টে থেকে ১৩ মার্চ প্রকাশিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়। শেয়ার করা ওই পোস্টের ক্যাপশনে ইংরেজিতে বলা হয়েছে, ‘ডিপফেক ভিডিও সতর্কতা! এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও, যা অপপ্রচার ছড়ানোর উদ্দেশ্যে বানানো হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ ধরনের ভুয়া ভিডিও ও কনটেন্ট সম্পর্কে অনুগ্রহ করে সতর্ক থাকুন।’
সিদ্ধান্ত
ইরান পরাজিত হলে সেটি ভারতের সাফল্য হবে—ভারতীয় সেনা কর্মকর্তার বরাতে প্রচারিত বক্তব্যটি বিভ্রান্তিকর। মূল ভিডিওতে ভারতের মেজর জেনারেল সি এস মান সামরিক সরঞ্জামে চীনা যন্ত্রাংশ ব্যবহার না করার বিষয়ে কথা বলেছেন। পরবর্তীকালে জেনারেল মানের কণ্ঠ নকল করে ভিডিওতে ভিন্ন বক্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত একটি ডিপফেক ভিডিও।