ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ সংকটে পড়েছে ভারত। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর ভারতীয় শোধনাগারগুলো প্রায় ৩০ মিলিয়ন (৩ কোটি) ব্যারেল রুশ তেল কিনেছে। এই লেনদেনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।
গত বছর থেকে মার্কিন চাপের মুখে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছিল এবং সেই ঘাটতি সৌদি আরব ও ইরাকের তেল দিয়ে পূরণ করছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের কারণে সেই সরবরাহ ব্যবস্থা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকা সংঘাত শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান জ্বালানি উৎপাদকদের সাথে বর্হিবিশ্বের সংযোগকারী ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
গত সপ্তাহের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় বা সবুজ সংকেত দেওয়ার পর ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন এবং রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় শোধনাগারগুলো স্পট মার্কেটে অবিক্রিত থাকা সব রুশ অপরিশোধিত তেল লুফে নিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই তেলের চালানগুলো ইতিমধ্যে জাহাজে বোঝাই করা ছিল কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল না। এর একটি বড় অংশ এশিয়ার জলসীমায় অবস্থান করছিল।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, উরালস, এসপো এবং ভারান্দেসহ বিভিন্ন গ্রেডের এই রুশ তেল বর্তমানে লন্ডনের ড্যাটেড ব্রেন্ট বেঞ্চমার্কের তুলনায় ব্যারেল প্রতি ২ থেকে ৮ ডলার প্রিমিয়ামে (অতিরিক্ত মূল্যে) বিক্রি হচ্ছে। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রুশ তেল একই মার্কারের তুলনায় ডিসকাউন্টে বা কম মূল্যে কেনাবেচা হতো।
গত ৫ মার্চের আগে জাহাজে তোলা রুশ তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য যদি কোনো ভারতীয় সংস্থা কেনে এবং তা ভারতে খালাস করা হয়, তবেই এই মার্কিন ছাড় কার্যকর হবে। এই ঘোষণার পরপরই যেসব ট্যাঙ্কার ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে যাচ্ছিল, সেগুলো আবার ভারতের দিকে ফিরে আসতে শুরু করেছে। এদের মধ্যে ‘মাইলো’ এবং ‘সারা’ নামক দুটি জাহাজ তাদের গন্তব্য সিঙ্গাপুর থেকে পরিবর্তন করে গত কয়েক দিনে ভারতের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইন্ডিয়ান অয়েল প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল এবং রিলায়েন্স অন্তত একই পরিমাণ রুশ তেল কিনেছে। তবে এ বিষয়ে ইন্ডিয়ান অয়েল বা রিলায়েন্সের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভারত ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়ার তেলের বড় ক্রেতা ছিল না। কিন্তু ২০২২ সালের শুরুতে ইউক্রেন আক্রমণের পর ভারত বড় পরিসরে রুশ তেল কেনা শুরু করে। পরবর্তীতে ক্রেমলিনের ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের এই পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। রাশিয়ার তেল সরাসরি নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকলেও ওয়াশিংটন রাশিয়ার দুটি বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করে রেখেছে।
তথ্য বিশ্লেষণী সংস্থা কেপলারের মতে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারত দৈনিক ২ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি রুশ তেল আমদানি করত। তবে মার্কিন চাপের মুখে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা কমে গড়ে দৈনিক ১.০৬ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছিল। এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে সেই চিত্র আবারও পাল্টে গেল।