ঈদযাত্রা সামনে রেখে সরকার গত সপ্তাহে জ্বালানি তেলের রেশনিং পদ্ধতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও মানুষের ভোগান্তি ঈদের ছুটির মধ্যে আরও প্রকট হয়েছে। মজুত না থাকার কথা জানিয়ে বহু ফিলিং স্টেশন জরুরি এই পরিষেবা বন্ধ রেখেছে। ডিজেল ও কেরোসিনের জোগান স্বাভাবিক থাকলেও পেট্রল বা অকটেন সংগ্রহ করতে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটতে হচ্ছে; বিশেষ করে ব্যক্তিগত যানে ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়া বহু নগরবাসী ফেরার ক্ষেত্রে মহাসংকটে পড়েছে।
চলমান সংকটকে পুঁজি করে তেলের কালোবাজারি শুরু হওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতির জন্য অযথা আতঙ্কিত ক্রেতাদের অবিবেচনাপ্রসূত বাড়তি কেনাকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী।
রাজধানীর বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে (ঈদের আগের দিন) সারা দেশে সরকারি তেল ডিপোগুলো বন্ধ ছিল। ঈদের দিন এবং তার পরের দিন রোববারও ডিপো ছিল বন্ধ। ফলে গত বৃহস্পতিবারের পর থেকে সোমবার পর্যন্ত কোনো ফিলিং স্টেশন নতুন করে তেল সংগ্রহ করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার রাতেই কিছু পেট্রলপাম্পের তেল শেষ হয়ে যায়। ঢাকায় যেসব পাম্পে বড় ধরনের মজুত ছিল, তারা শনিবার মধ্যরাত পর্যন্ত পেট্রল ও অকটেন বিক্রি করতে পেরেছে। রোববার ঢাকার বেশ কিছু পাম্পে ডিজেলের জোগান থাকলেও পেট্রল ও অকটেনের ভোক্তারা ফিরেছে খালি হাতে।
পাম্পমালিকদের অভিযোগ, সরকার রেশনিং শিথিল করার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে ডিপো থেকে তেল এখনো সীমিতভাবেই মিলছে। তেলের লরিগুলো ডিপো থেকে অর্ধেক বা তার কিছু কমবেশি অবস্থায় ফিরে আসছে। অনেক পাম্পে দৈনিক ১৩-১৮ হাজার লিটার অকটেনের চাহিদা থাকলেও ডিপো থেকে দিচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার লিটার থেকে ৯ হাজার লিটার। হাতে গোনা দু-একটি পাম্প ১৩ হাজার লিটার পর্যন্ত তেল পাচ্ছে। এই অবস্থায় ক্রেতাদের তাদের চাহিদামতো পর্যাপ্ত তেল দেওয়ার কারণে বিকেল কিংবা সন্ধ্যা নাগাদই জ্বালানির মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানি তেল বিপণনের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তিনটি কোম্পানি রয়েছে—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল কোম্পানি। সরকার এ তিন কোম্পানির মাধ্যমে বেসরকারি ফিলিং স্টেশনগুলোয় পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল সরবরাহ করে থাকে।
বাড়তি ক্রয় দায়ী: মন্ত্রী
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ডিপো থেকে সরবরাহের কথিত ঘাটতির বিষয়ে কিছু বলেননি; বরং তিনি গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘লোকে হঠাৎ করে পাম্পে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। কিন্তু অন্য সময় যেভাবে তেল বিক্রি করে থাকে, সেই জোগানই রেখেছে। তাহলে তো পাম্পে লাইন থাকবে, অনেকে তেল পাবে না, এটা স্বাভাবিক। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করতে আমি সবাইকে অনুরোধ করেছিলাম, এখনো করছি। ১০ জনের খাবার একজন খেয়ে ফেললে তো সংকট হবেই।’
আড়াই শ টাকায় ১ লিটার
সংকটকে পুঁজি করে কেউ কেউ কালোবাজারে তেল বিক্রি করছে। প্রতি লিটার পেট্রল ও অকটেনের প্রকৃত মূল্য ১১৬-১২০ টাকা হলেও কালোবাজারে তা ২৫০ টাকায়ও বিক্রি হতে দেখা গেছে। রাজশাহী থেকে ঢাকায় আসা একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জানিয়েছেন, পরিচিত বলে বিশেষ বিবেচনায় তাঁকে ১৬০ টাকা লিটারে তেল দিয়েছেন একজন। তেল না পাওয়া অন্য গ্রাহকেরা জানলে ক্ষিপ্ত হবেন—এই আশঙ্কায় তেলের জেরিকেন চটের ব্যাগের ভেতরে ভরে তাঁকে পৌঁছে দেওয়া হয়।
ভোগান্তি রাজধানীসহ দেশজুড়ে
ঢাকার তুলনায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ঈদের বন্ধে জ্বালানি তেলের সংকট ছিল বেশি প্রকট। বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী ছাড়া এর অন্যতম কারণ। রাজধানীর বাইরে অনেক পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে কর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে।
ঈদের ছুটির পর গতকাল প্রথম কর্মদিবসে রাজধানীর বহু পাম্পে পেট্রল, অকটেন পাওয়া যায়নি। কিছু পাম্প নিজেদের সিদ্ধান্তেই রেশনিং করছে। সকালের দিকে কোনো কোনো পাম্পে বলা হয়, সন্ধ্যা নাগাদ তেল আসার সম্ভাবনা আছে।
তেজগাঁওয়ের সততা ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক বাবুল মিয়া গতকাল দুপুরে জানান, সোমবার যে পরিমাণ অকটেন এসেছিল, তা রাত আড়াইটায় শেষ হয়ে গেছে। ডিজেল আছে। গতকাল দিবাগত রাতের মধ্যে সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন আসবে।
সাউদার্ন ফিলিং স্টেশনের আরিফ হোসেন বলেন, ‘সোমবার সন্ধ্যার দিকে আমাদের অকটেনের মজুত শেষ হয়ে গেছে। তবে ডিজেলের সরবরাহ চালু রয়েছে। ভোর ৪টার দিকে তেলের লরি ডিপোতে গেছে। দুপুরের মধ্যে চলে আসবে বলে আশা করছি।’
তবে কিছু তেল থাকলেও পরিস্থিতির কারণে নিজেরাই আবার রেশনিং শুরু করেছে ক্লিন ফুয়েল নামের একটি পেট্রলপাম্প। এর ব্যবস্থাপক সরওয়ার আলম বলেন, তাঁদের ১৩ হাজার লিটার দৈনিক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় বেশ কম। বাধ্য হয়ে তাঁরা মোটরসাইকেলের জন্য ৩০০ টাকা এবং প্রাইভেট কারের জন্য ২ হাজার টাকার তেল দিচ্ছেন।
আজকের পত্রিকার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, তেলের সংকটে দেশের বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশন বন্ধ রয়েছে। যেসব পাম্পে তেল রয়েছে, সেখানে গাড়ির দীর্ঘ সারি। ‘বন্ধ’ বা ‘তেল নাই’ লেখা পাম্পের সামনেও অনেকে অপেক্ষা করছে। কোনো কোনো পাম্পে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের পেট্রলপাম্পগুলো খোলা থাকলেও সেখানে শুধু ডিজেল বিক্রি হচ্ছে। বেশির ভাগ পাম্পেই প্রবেশের মূল দরজা একেবারে বন্ধ করে তেল বিক্রি পুরো বন্ধ রাখা হয়েছে। গতকাল দুপুরে টাইগারপাস সড়কের টাইগারপাস এজেন্সিজ লিমিটেড, দামপাড়ার সিএমপি ফিলিং স্টেশন, লালখান বাজারের এস কে কাহম, আমিন জুট মিলস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ফিলিং স্টেশন, প্রবর্তক মোড়ের আলহাজ ফয়েজ আহমেদ অ্যান্ড সন্স, ষোলশহরের বাদশা মিয়া অ্যান্ড সন্স পেট্রলপাম্পে কোনো জ্বালানি তেল বিক্রি করতে দেখা যায়নি।
টাইগারপাস এজেন্সিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মো. শওকত আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দুই দিন ধরে অকটেন ও পেট্রল মিলে আমাদের ২ হাজার লিটার দেওয়া হয়েছে। অথচ আমার এখানে দিনে শুধু অকটেনেরই চাহিদা থাকে সাড়ে ৪ হাজার লিটারের বেশি। আমরা এখন শুধু ডিজেল বিক্রি করছি।’
রাজশাহী পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি মিজানুর রহমান রতন জানান, জ্বালানি তেলের মজুত শেষ হওয়ায় সোমবার থেকে জেলার ৭২টি পেট্রলপাম্পের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।
রাজবাড়ীর ১০টি পেট্রলপাম্পের একটিতেও তেল না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন যানবাহনের মালিক ও চালকেরা। গত সোমবার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় ‘তেল নাই’ নোটিশ। শহরের কাজী ফিলিং স্টেশনে সরকারি চাকরিজীবী লুৎফর রহমান বলেন, ‘সকালে কুষ্টিয়া থেকে রওনা দিয়েছি। রাজবাড়ী পর্যন্ত যত পাম্প পেয়েছি, একটাতেও তেল নেই।’
লুৎফর রহমান অভিযোগ করেন, এ পরিস্থিতির জন্য পাম্পমালিকদের ‘সিন্ডিকেট’ দায়ী।
গাইবান্ধায় এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছে ক্রেতারা। ফিলিং স্টেশনগুলোয় তেলের অভাব থাকলেও স্থানীয় হাটবাজারে প্রকাশ্যেই অতিরিক্ত দামে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে।
মোটরসাইকেলচালক জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘পাম্পে তেল না থাকলেও আশপাশে বোতলে করে বেশি দামে সেই তেল বিক্রি হচ্ছে। মেহেরপুরের গাংনীতে বেশি দামে তেল বিক্রি হতে দেখেছি।’
কুড়িগ্রামের ২০টি ফিলিং স্টেশনের সব কটি বন্ধ রয়েছে। তেল না পাওয়ায় জেলা শহরের খলিলগঞ্জে অবস্থিত এস এস ফিলিং স্টেশনে কয়েকজন গ্রাহক হামলার চেষ্টা করে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ফুয়েল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জামান আহমেদ বলেন, তেল না থাকায় মালিকেরা পেট্রলপাম্পগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাগেরহাটের ফিলিং স্টেশনগুলোতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে পর্যাপ্ত তেল মিলছে না। ইউনুস শেখ নামের একজন মোটরসাইকেলচালক জানিয়েছেন, শহরের খারদ্বার এলাকায় দুটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে পেট্রল না পেয়ে তিনি ১১ কিলোমিটার দূরে সাইনবোর্ড বাজারে যান। সেখানকার পাম্পে ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার তেল পান তিনি।
বিপাকে অনেক পর্যটকও
ঈদের ছুটিতে দূরের পার্বত্য অঞ্চলে বেড়াতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে বহু পর্যটক; বিশেষ করে যারা নিজের মোটরসাইকেলে চড়ে গেছে। তেল সরবরাহ না থাকায় খাগড়াছড়ি সদরের কয়েকটি ফিলিং স্টেশন বন্ধ রয়েছে। উপজেলাগুলোর অধিকাংশ খুচরা দোকানেও তেল সরবরাহ বন্ধ। পর্যটক বাইকার আরিয়ান বলেন, ‘ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি পর্যন্ত এসেছি। কিন্তু এখান থেকে সাজেক যাওয়া-আসার তেল বাইকে নেই। এখন কী করব।’
তেলের অভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়া পর্যটকবাহী আড়াই শ গাড়ি সাজেক পর্যন্ত যেতে পারেনি। ফলে ফিরে গেছে বহু পর্যটক।
সাজেকের কাউন্টার ম্যানেজার মো. আরিফ জানান, সমিতির ৬০০ গাড়ির মধ্যে গতকাল তেল সংকটের কারণে ১০০ পিকআপ, ১০০ জিপ (চাঁদের গাড়ি), ৫০টি সাফারিসহ অনেক গাড়ি সাজেক যেতে পারেনি।