৩২ দিন ধরে আমি ইরান যুদ্ধ খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। ক্ষেপণাস্ত্র, জ্বালানি তেলের দাম, বন্ধ (হরমুজ) প্রণালি, বাংকার বাস্টার, কূটনীতি—সবই বিফলে যাচ্ছে।
এই যুদ্ধ আমার জানামতে, সবচেয়ে সেরা আর্থিক শিক্ষা। আপনি যদি গভীরভাবে ভেবে দেখেন, এই যুদ্ধ আমাদের পাঁচটি বিষয় শেখাচ্ছে—
১. টাকা কোনো নিরাপত্তা দিতে পারে না। টাকা সব সময় ধ্বংস হয়।
২৮ ফেব্রুয়ারির আগে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৫ মার্কিন ডলার। আজ (মঙ্গলবার) এই দর ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে। মাত্র ৩২ দিনে তেলের দর বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৭ শতাংশ।
কিন্তু আপনার সঞ্চয় এই সময়ে ৭৭ শতাংশ বাড়েনি। আপনার বেতন ৭৭ শতাংশ বাড়েনি। কিন্তু আপনার দৈনন্দিন খরচ, জ্বালানি খরচ, বিদ্যুৎ বিল—সব ঠিকই বেড়ে গেছে।
আপনার অর্জিত আয় এবং সবকিছুর দামের ঊর্ধ্বগতির যে পার্থক্য—সেটাই হলো মূল্যস্ফীতি। এই মূল্যস্ফীতি কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা নয়। যেকোনো সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কার পূর্বাভাসযোগ্য ফলাফলই হলো মূল্যস্ফীতি। কোনো যুদ্ধ, কোনো সরকার এই ভার বইতে সক্ষম নয়।
আমার ধনী বাবা টাকাকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে—এটি এমন একটি বিনিয়োগ, যা আপনার ধীরলয়ে পরাজয় নিশ্চিত করে। তিনি বলেছিলেন, ‘সঞ্চয়কারীরা থাকে পরাজিতের দলে। তাই বলে সঞ্চয় করা ভুল কিছু নয়। কিন্তু টাকার মান দিনে দিনে কমে। আজ যে টাকা তুমি সঞ্চয় করলে, কাল তার দাম কমে যাবে। এক বছর পর তার দাম আরও কমবে।’
যে মানুষগুলো তেল, সোনা, রুপা, জ্বালানির শেয়ার, আবাসন খাতের সম্পদ ধরে রেখেছেন, তাঁরা দেখেছেন, এই যুদ্ধ শুরুর পর কীভাবে তাদের সম্পদ বেড়েছে। কিন্তু যে মানুষগুলো টাকা ধরে রেখেছে, তারা এরই মধ্যে অনুধাবন করতে শুরু করেছে, কীভাবে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
যুদ্ধ একটাই—কিন্তু দুই ক্ষেত্রে ফলাফল একেবারেই ভিন্ন।
২. সরকার সব সময়ই তার ব্যবস্থাকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে, আপনাকে নয়। আইইএ (আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা) কৌশলগত মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এত তেল এর আগে কখনো ছাড়া হয়নি। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তেলের দাম ১৭ শতাংশ বেড়ে গেছে। এরপর বাজার শান্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র রুশ তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করার হুমকি দিলেন। এতে তেলের দাম আরও বেড়ে গেল।
এই যুদ্ধে মার্কিন সরকারের প্রতিটা পদক্ষেপই আর্থিক ব্যবস্থা, ডলার, সরবরাহ শৃঙ্খল আর স্টক মার্কেটকে রক্ষা করার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয়েছে। আপনার সঞ্চয় রক্ষা করতে নয়। আপনার জ্বালানির খরচ কম রাখতে নয়। আপনার দৈনন্দিন সাংসারিক খরচ কম রাখতে নয়।
আমি যখন ছোট, আমার ধনী বাবা আমাকে এ বিষয়টি শিখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘রবার্ট, সরকার তোমার আর্থিক অংশীদার নয়। সে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী। তোমার আয়ের ওপর কর বসায় সরকার। মূল্যস্ফীতি ঘটিয়ে তোমার সঞ্চয় কমিয়ে দেয়। ব্যাংককে দেউলিয়া করে সে। তারপর সে বলে, স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যই এসব করা হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির গড় দাম চলতি সপ্তাহে প্রতি গ্যালন চার ডলার ছাড়িয়েছে। সরকার তার জরুরি মজুত থেকে সরবরাহ করেছে। তারপরও জ্বালানির দাম এখনো চার ডলার। কেউ কিন্তু আপনার ট্যাংক ভরতে এগিয়ে আসবে না।
৩. যে মানুষগুলো এই সংকটকে আঁচ করতে পেরেছিল, তারা আগেভাগেই কিনে ফেলেছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৫ ডলার। সব বিশ্লেষকই জানতেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সব সামরিক বিশেষজ্ঞ জানতেন, পৃথিবীর বুকে হরমুজ প্রণালি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। সব জ্বালানি অর্থনীতিবিদ জানতেন, এই প্রণালি বন্ধ হলে দ্রব্যমূল্যে কী প্রভাব পড়বে।
সব তথ্যই ছিল। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ সে তথ্য অনুযায়ী কাজ করেনি। ধনী আর গরিবের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো পার্থক্য নেই। এই দুই শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য হলো—একই তথ্য জেনেও তারা ভিন্নভাবে কাজ করে।
যে সময় এই যুদ্ধ গণমাধ্যমের প্রথম পাতায় ঠাঁই পেয়েছে, ততক্ষণে সুযোগ চলে গেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে, তেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এত কিছুর পর সবার টনক নড়েছে। ততক্ষণে ‘স্মার্ট মানি’ তার কাজ করে ফেলেছে।
৪. প্রতিটা সংকটেই দুটি পক্ষ থাকে—পরাজিত ও বিজয়ী। আপনি কোন পক্ষে, সেটাই বিবেচ্য বিষয়। এয়ারলাইনস ব্যবসা হুমকিতে, পর্যটন ব্যবসা হুমকিতে, বৈশ্বিক পরিবহনব্যবস্থা বিপর্যস্ত, মার্কিন শেল ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লাভের মুখে। পার্মিয়ান বেসিনের ব্যবসায়ীদের জন্য তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩০ থেকে ৪৫ ডলার হলেই খরচ উঠে যায়। তারা এখন ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার করে পকেটে পুরছে।
অথচ সোনার দাম মার্চে ১৪ শতাংশ পড়েছে। মূল্যবান এই ধাতুর দাম কিন্তু বাড়েনি। কেন? ইরান যুদ্ধ মূল্যস্ফীতির ভয় এতটা প্রকট করেছে যে ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) এখন সুদহার আরও বাড়ানোর চিন্তা করছে। সুদহার বৃদ্ধি মানে সোনা বাজারে ক্রেতা কমে যাওয়া। কাজেই যে যুদ্ধ তেলের দাম ১১৫ ডলারে তুলেছে, সেই একই যুদ্ধ সোনার দর কমিয়ে দিয়েছে। আমি কিন্তু এখন সোনা কেনার পক্ষে। কারণ, দর কম, কেনার এটাই উপযুক্ত সময়।
৫. ৩২ দিন আগে বেশির ভাগ মানুষ ভেবেছিল, ‘দেখি (যুদ্ধের) কী হয়।’ তেলের দাম তখন ছিল ৬৫ ডলার। এখন ১১৫ ডলার। যে মানুষগুলো নিরাপদ বোধ করতে অপেক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা কিন্তু এই ৭৭ শতাংশ দরবৃদ্ধির সুযোগ হাতছাড়া করেছে।
আমি যখনই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতাম, আমার ধনী বাবা প্রায়ই একটি প্রশ্ন করতেন— ‘রবার্ট, তুমি ঠিক কিসের জন্য অপেক্ষা করছ? নিরাপত্তা? তোমাকে একটা জিনিস বলি। নিরাপত্তা হলো তোমার কেনা সবচেয়ে দামি বস্তু। কারণ, সুযোগ হাতছাড়া করার বিনিময়ে তোমাকে এটি অর্জন করতে হয়।’
ইরান যুদ্ধ কোনো সুযোগ সৃষ্টি করেনি। এটি একটু সুযোগের চেহারা উন্মুক্ত করেছে। এই সুযোগ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ফেলা প্রথম বোমা পর্যন্ত ছিল। তখনো বেশির ভাগ মানুষ বোঝার চেষ্টা করছিল, কী ঘটতে চলেছে। যারা আর্থিকভাবে শিক্ষিত, তারা কিন্তু তখনই জেনে গিয়েছিল, কী করতে হবে।
আমি লাখো ডলার কামিয়েছি। হারিয়েছিও লাখো ডলার। আবার আয় করেছি। ৫০ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি টাকাকে চিনেছি। বিশ্ব কখনোই সংকটমুক্ত হতে পারবে না এবং প্রতিটা সংকটই একটি শ্রেণিকক্ষ। এর থেকে শিক্ষা নিন।
লেখক: ‘রিচ ড্যাডি পুওর ড্যাডি’ গ্রন্থের রচয়িতা
[লেখাটি রবার্ট কিয়োসাকির ভ্যারিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্ট থেকে অনুবাদকৃত]