উঠানে হাঁটুপানি। সেই পানিতে ভাসছে শেওলা। প্রথমে মনে হবে পরিত্যক্ত বাড়ি। অথচ এই বাড়িতেই স্বামী-সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন রেখা হালদার। রাস্তা থেকে বাড়িতে ঢুকতে একমাত্র ভরসা বাঁশের সাঁকো। ঘর থেকে পানি সরলেও এখনো কর্দমাক্ত রান্নাঘর, গোয়ালঘর।
রেখা হালদারের বাড়ি যশোরের কেশবপুর উপজেলার মনোহরনগরে। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলছিলেন, ‘এখন তো গরমকাল। তাতেই এই অবস্থা। বর্ষাকালে বাড়িতে থাকা যায় না। গরু-ছাগল, জিনিসপত্র নিয়ে সংসার বাঁধতে হয় উঁচু রাস্তার পাশে। এভাবে কি মানুষ বাস করে! আমাদের কি এই সমস্যার কোনো দিন সমাধান হবে না?’ একই অবস্থা রেখার প্রতিবেশী গৌরী হালদারের। বাড়িতে হাঁটুপানির কারণে দুই ছেলে তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে বাড়ি ছেড়েছেন। শুধু রেখা বা গৌরী নন, একই অবস্থা এ অঞ্চলের লাখো মানুষের।
সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আজ শনিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পর্যালোচনা সভা আহ্বান করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সভায় এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।
যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ভবদহ অঞ্চল। পলি পড়ে এই অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ নাব্যতা হারিয়েছে। ফলে এসব নদ-নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশন হয় না। দীর্ঘ চার দশক ধরে স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে চলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন।
ভবদহে নতুন তিন প্রকল্প
চার দশকের এই জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত সময়ে নেওয়া হয়েছিল হাজার কোটি টাকার ২১টি প্রকল্প। কার্যত সেগুলোতে কোনো সুফল মেলেনি ভবদহবাসীর। অভিযোগ, প্রকল্পের নামে হয়েছে লুটপাট। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে এবার তিনটি মেগা প্রকল্প নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
২৬৮ কোটি টাকার দুটি প্রকল্পের আওতায় নদ-নদী ও খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কপোতাক্ষ নদের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে হরি, তেলিগাতী, হরিহর, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী—এই ছয় নদ-নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। একই প্রকল্পের আওতায় ৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চলছে নদ-নদীর সঙ্গে যুক্ত ২৪টি খাল পুনঃখনন।
৪৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে সেচসুবিধা সম্প্রসারণ প্রকল্প। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৪৯ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ অভয়নগর উপজেলার আমডাঙ্গা খাল সংস্কার করা হবে। তবে ভবদহের ভুক্তভোগীরা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নদ-নদী খননের পাশাপাশি পরিকল্পিত উপায়ে জোয়ার-ভাটা (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট-টিআরএম) চালু করতে হবে। স্থায়ী সমাধানের জন্য চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় উজানে মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে ভৈরব নদের পুনঃসংযোগ দিতে হবে। এতে নদী দিয়ে আসা পলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একদিকে যেমন সচল হবে নদী; অন্যদিকে নিরসন হবে জলাবদ্ধতা।
পাউবো অবশ্য বলছে, টিআরএম চালু না হলেও পলি ব্যবস্থাপনার জন্য ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সেখানে পাসের পর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। সেখানে নীতিগত সিদ্ধান্তের পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) পাঠানো হবে। একনেকে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর বাস্তবায়নকাজ শুরু হবে।
টিআরএম ছাড়া নদী কাটা ‘বৃথা’
মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর গ্রামের শেখর বিশ্বাস বলেন, ‘নদী কাটার কাজ চললেও কোথাও কোনো সাইনবোর্ড নেই। কীভাবে নদী কাটা হচ্ছে, তার কোনো তথ্য জানতে পারছি না। নদী কেটে ফেলে রাখলে দুই পূর্ণিমার জোয়ারের পলিতে ভরাট হয়ে যাবে। এখনই টিআরএম করতে পারলে নদী সচল হতো; কিন্তু তখন টিআরএম করে কোনো কাজ হবে না। পুরোটাই বৃথা যাবে।’
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল, স্বচ্ছতার সঙ্গে নদী কাটতে হবে। টিআরএম চালু করতে হবে। অন্যথায় খুব দ্রুত পলিতে নদী ভরাট হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে টাকার অপচয় হবে। আর স্থায়ী সমাধানের জন্য চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় মাথাভাঙ্গা নদীর সঙ্গে ভৈরব নদের পুনঃসংযোগ দিতে হবে। এ ছাড়া আমডাঙ্গা খাল সংস্কার করতে হবে। কিন্তু নদী কাটার কর্মকাণ্ড জনসমক্ষে প্রচার করা হচ্ছে না। এতে কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।’
পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, ছয়টি নদ-নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলছে। ২৪টি খালের ৭৮ দশমিক ২৩০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। আমডাঙ্গা খালের জমি অধিগ্রহণের কাজ বাস্তবায়নের পর্যায়ে আছে। জমি অধিগ্রহণের পর খালের সংস্কারকাজ শুরু হবে। আপৎকালীন সময়ে দ্রুত পানি বের করে দেওয়ার জন্য ৩৫ কিউসেক ক্ষমতার আটটি পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। পলি ব্যবস্থাপনার জন্য ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ডিপিপি মন্ত্রণালয়ে পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ভবদহের জলাবদ্ধতা আর থাকবে না।