রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা নিরসনে স্বল্প মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য ২৬টি প্রস্তাব নিয়ে কাজ করবে সরকার। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করা হয়। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নের মতো কিছু বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে প্রস্তাবে। বিশেষজ্ঞের মতে, যানজট কমাতে প্রস্তাবগুলো কার্যকর। তবে একে সফল করতে বিশেষ করে প্রযুক্তিগত বিষয়গুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ অপরিহার্য।
সিদ্ধান্ত হয়েছে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও অংশীজন সমন্বিতভাবে কাজ করবে। সরকারের প্রত্যাশা, এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকার যানজট সমস্যার অনেকটাই নিরসন করা সম্ভব হবে। পরে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর রাজধানীর যান চলাচল পরিস্থিতিতে ‘ব্যাপক পরিবর্তন’ আসবে।
‘ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন’ বিষয়ক সভায় ডিএমপি, ডিটিসিএ, বিআরটিএ, দুই সিটি করপোরেশন, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বুয়েট এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপস্থাপিত প্রস্তাবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার কথা বলা হয়েছে। এতে টোল আদায়ের গতি বেড়ে সংশ্লিষ্ট সড়কের যানজট কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিআরটিসির সিটি বাসকে টিকিট ও নির্দিষ্ট স্টপেজভিত্তিকভাবে পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এটি বেসরকারি বাস সার্ভিসের জন্যও একটি মানদণ্ড তৈরি করবে। এর লক্ষ্য যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ ও বিভিন্ন কোম্পানির বাসের মধ্যে যাত্রী ধরার অসুস্থ প্রতিযোগিতা কমানো।
অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে গাবতলী এলাকার যানজট নিরসনে আমিনবাজারের দিক থেকে মূল শহরের দিকে আসা যানবাহনের জন্য গাবতলীর বিআরটিসি বাস ডিপোর ভেতর দিয়ে একটি পৃথক করিডর নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বনশ্রী ও আফতাবনগরের মধ্যবর্তী খালের ওপর দুটি সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে স্বদেশ প্রপার্টি হয়ে আফতাবনগর পর্যন্ত একটি বাইপাস সড়ক উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি মেট্রোরেলের লাইন-১ নির্মাণের সময় বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পার্কিং ভবন দ্রুত চালুর মাধ্যমে বিমানবন্দর এলাকায় পার্কিং সংকট কমাতে হবে। সড়কের মাঝখানে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি অপসারণ করা হবে। পদচারী-সেতুসংলগ্ন ফুটপাত ও মিডিয়ানের সংস্কার, আধুনিক বাস বে নির্মাণ এবং ট্রাফিক সিগন্যাল ও পথচারীদের রাস্তা পারাপারের সংকেত বাতি স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
শৃঙ্খলাজনিত প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ঢাকা মহানগরের ভেতরে থাকা দূরপাল্লার নাইট কোচের কাউন্টার উচ্ছেদ, ফুটপাত ও সড়ক বিভাজকে বেড়া স্থাপনের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত পারাপার বন্ধ, সড়কের পাশ থেকে অস্থায়ী টংজাতীয় দোকান অপসারণ, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা অপসারণ করা ইত্যাদি। সড়কে থাকা হকারদের ব্যবস্থাপনায় সপ্তাহভিত্তিক বসার সময় নির্ধারণ ও অন্তত আটটি হলিডে মার্কেট গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
লেভেল ক্রসিংয়ে রেলগেট বন্ধ থাকার সময় কমানো এবং কিছু ফিলিং স্টেশনে সিএনজি বিক্রি বন্ধ রাখার মাধ্যমে সড়কে যানবাহনের জটলা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সভায় ঢাকার তিনটি আন্তজেলা বাস টার্মিনালে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বাসের রুট পারমিট বাতিলের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি গুলিস্তানে একটি সিটি বাস টার্মিনাল নির্মাণ এবং আন্তজেলা বাস অপসারণে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ট্রাফিক পুলিশ ও চালকের বিতণ্ডা বন্ধ করে সময় বাঁচাতে এআইভিত্তিক সিসি ক্যামেরা ও স্পিড ক্যামেরা স্থাপন করে মামলা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিটিসিএকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে এনে এর কার্যক্রম গতিশীল করা এবং ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের জনবল বাড়ানোর সুপারিশও প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ, গাড়ি রাখার জন্য বিদ্যমান পার্কিং ভবন ও বেসমেন্টের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং স্কুল ও অফিসের সময়সূচি ভিন্ন ভিন্ন করা। সভায় আশা প্রকাশ করা হয়, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর যানজট পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি আসতে পারে।
সভায় যানজট নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক ডাইভারশন চালু ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যবস্থা নেওয়াসহ ডিএমপির সাম্প্রতিক কয়েকটি কার্যক্রম সম্পর্কেও অবহিত করা হয়। টিকিট ও নির্দিষ্ট স্টপেজভিত্তিক বাস সার্ভিস চালুর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলে জানানো হয়।
সভার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদি যেসব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো মোটামুটি এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ বাস্তবায়ন করতে পারব। ফলে আগামী এপ্রিলের মধ্যে ঢাকা শহরের যানজট সমস্যার অনেকটা নিরসন হবে। এরপর মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। তারপর ট্রাফিক সিস্টেমের একটা ব্যাপক পরিবর্তন হবে।’
সভায় রাজধানীর যানজট নিরসনে মধ্যমেয়াদি ১৩টি এবং দীর্ঘমেয়াদি ১২টি প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়। সভা সূত্র জানিয়েছে, সময়স্বল্পতার কারণে এদিনের সভায় এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়নি। এপ্রিলের মাঝামাঝি এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।
এসব প্রস্তাবের বিষয়ে মত চাইলে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রস্তাবগুলো মোটামুটি ঠিক আছে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে কিছু আছে, যেগুলো বাস্তবায়ন করতে বড় বিনিয়োগ করতে হবে না। খুব কম বিনিয়োগেই সড়কের সক্ষমতা বাড়ানো যায়। যদি কিছু বিকল্প সড়ক তৈরি করা যায় এবং ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন আনা যায়, তাহলে যানজট নিরসন করা সম্ভব। এ ছাড়া স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনা (বাসে জিপিএস ট্র্যাকার, লেভেল ক্রসিং অটোমেশন, টিকিটিং ইত্যাদি) চালু করলে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর হবে। তবে উদ্যোগগুলো দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর রাখতে পর্যবেক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ অপরিহার্য।’