অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) সংকটে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালের হিসাব অনুযায়ী, ইআরএলে অপরিশোধিত তেল রয়েছে মাত্র ২৩ হাজার টন, যা পরিশোধন করতে সর্বোচ্চ ৭ দিন লাগতে পারে। ফলে এ রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যেতে পারে ৭ এপ্রিল। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে অপরিশোধিত তেলের সর্বশেষ জাহাজটি এসেছে। ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি পার হয়ে আর কোনো অপরিশোধিত তেলের জাহাজ দেশে আসতে পারেনি। তবে তিনটি জাহাজ দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। সেগুলো আসতে কত দিন লাগবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। স্বাভাবিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানির জাহাজ আসতে ১২ থেকে ১৫ দিন প্রয়োজন হয়।
এ বিষয়ে জানতে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাতের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এরপর ফোন করা হয় বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান ও সচিব শাহিনা সুলতানাকে। তাঁরাও কোনো সাড়া দেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ক্রুড অয়েল রাখার ট্যাংক রয়েছে আটটি। এর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণ চলছে দুটি ট্যাংকের। বাকি ছয়টি ট্যাংকে উল্লিখিত ২৩ হাজার টন ক্রুড অয়েল মজুত রয়েছে। ইআরএলে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয়। বর্তমানে তেলের মজুত কমে আসায় পরিশোধনের পরিমাণও কিছুটা কমিয়ে ৩ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টনে নামানো হয়। সেই হিসাবে, ৬ এপ্রিল পর্যন্ত পরিশোধন কার্যক্রম চালানো যাবে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইস্টার্ন রিফাইনারির একাধিক কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, সুপার ট্যাংকার এমটি নরডিক কোলাক ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে সৌদি আরবের রাস্তানুরা বন্দরে রয়েছে। গত ৩ মার্চ থেকে এটি দেশে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। ২২ মার্চ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল লোডের অপেক্ষায় রয়েছে আরও একটি জাহাজ। ১ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসাও থমকে আছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। একপর্যায়ে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচল থমকে যায়। এ অবস্থায় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে জ্বালানির সংকট দেখা দেয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, ১৮ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ একটি জাহাজে করে অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় অপরিশোধিত তেলের আর কোনো জাহাজ আসেনি।
বিপিসির তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইআরএল পরিশোধন করে ৭ লাখ ৩২ হাজার ২৩০ টন ডিজেল, ৩ লাখ ৮৬ হাজার ২২৯ টন ফার্নেস অয়েল, ৫৯ হাজার ১৫০ টন পেট্রল, ৫৬ হাজার ৯৩৪ টন কেরোসিন, ৫৭ হাজার ৪১৪ টন বিটুমিন, ১৬ হাজার ১৮৭ টন এলপিজি, ৮ হাজার ৭১ টন জেবিও (জুট ব্যাচিং অয়েল) এবং ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫২৯ টন ন্যাফথা বিপিসিকে সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর ৯২ শতাংশ আমদানি করতে হয় বিপিসিকে। অবশিষ্ট ৮ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে পাওয়া যায়। সরবরাহ করা জ্বালানির মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি পরিশোধন করে ইআরএল।
বেসরকারি পারটেক্স পেট্রো লিমিটেডের কর্মকর্তা মো. মামুন জানান, দেশের বেসরকারি রিফাইনারিগুলো অপরিশোধিত তেল আমদানি করে না। তারা ন্যাফথা ও কনডেনসেট আমদানি করে। সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তৈরি করে।