হোম > বিশ্লেষণ

পছন্দের আলোচক ভ্যান্সকেই পেল ইরান, কতটা ফায়দা নিতে পারবে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: এএফপি

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আজ শনিবার স্থানীয় সময় দুপুরের দিকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন। উদ্দেশ্য ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ ও দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব কমানো নিয়ে আলোচনা। আলোচনায় জেডি ভ্যান্সের অংশগ্রহণ তেহরানের একটি দীর্ঘদিনের ইচ্ছা পূরণ করবে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের কিছু নেতা নীরবে চেয়েছিলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টই নেতৃত্ব দিন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরান মনে করে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে ভ্যান্স অন্যতম যুদ্ধবিরোধী ব্যক্তি। এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা এবং আলোচনার সঙ্গে যুক্ত চারজন সূত্র এ তথ্য জানিয়েছেন।

ভ্যান্সের এই ভাবমূর্তি তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের দীর্ঘদিনের অংশ। এ কারণেই তেহরান মনে করছে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি আন্তরিকভাবে একটি সমঝোতা চুক্তির চেষ্টা করতে পারেন। সংবেদনশীল কূটনৈতিক বিষয় হওয়ায় সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা জানিয়েছে।

তবে এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে, ভ্যান্স অন্য কোনো প্রতিনিধির তুলনায় বেশি নমনীয় অবস্থান নেবেন। আলোচনায় ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও বোমা হামলা শুরু করতে পারে—এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তানে আলোচনায় ভ্যান্সকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত একান্তই ট্রাম্পের। কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তিনিই নেবেন।

তবুও, ভাইস প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি এবং তেহরানে তাঁর সম্পর্কে ধারণা কতটা সঠিক—তা নির্ধারণ করবে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম মুখোমুখি এই আলোচনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কতটা। চলতি বছরের নভেম্বরে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের সাত মাস আগে, এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের জন্যই এই আলোচনার গুরুত্ব অনেক।

ভ্যান্সের জন্য ঝুঁকি ও সম্ভাবনা

২০২৮ সালে রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে আগেভাগেই এগিয়ে থাকা ভ্যান্স আলোচনায় সফল হলে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন। তবে আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে বা ব্যর্থ হলে, হাজারো বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত এক জটিল বিদেশি সংকটে তাঁর নাম আরও জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

মার্কিন থিংক ট্যাংক কার্নেগি এনডাওমেন্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও ইতিহাসবিদ স্টিফেন ভার্থেইম বলেন, ‘যদি শান্তি আলোচনা ভালো ভাবে এগোয় এবং জনপ্রিয় কোনো ফলাফল আসে, তাহলে ভ্যান্সের ভাবমূর্তি উন্নত হতে পারে। তবে ঝুঁকিও আছে—তিনি যুদ্ধের মুখ হয়ে উঠতে পারেন।’

ভ্যান্সের সঙ্গে থাকবেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। সূত্রগুলো জানায়, অতীতে তাদের সঙ্গে দুই দফা আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চালানোর কারণে ইরানি নেতারা এই দুজনকে অবিশ্বাসের চোখে দেখেন। এক প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের আরেক কর্মকর্তা দাবি করেন, ইরান ভ্যান্সের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। তিনি বলেন, আলোচনার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ভ্যান্স বা তার ঘনিষ্ঠদের কেউ ভাবছেন না।

তিনি আরও বলেন, ‘মূলধারার গণমাধ্যমের এই ধারণা যে, ইরান ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়—এটি একটি সমন্বিত প্রচারণা, যা বিশ্বাস করা হাস্যকর।’ তবে তৃতীয় এক কর্মকর্তা জানান, ইরান আসলেই চেয়েছে ভ্যান্স আলোচনায় যুক্ত হোন, যদিও এর কারণ তাঁরা স্পষ্ট করেনি।

এর আগে, গতকাল শুক্রবার সকালে পাকিস্তানের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় ভ্যান্স বলেন, ইরানও একইভাবে এগোলে যুক্তরাষ্ট্র আন্তরিকভাবে আলোচনা করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই খোলা মনে এগোতে প্রস্তুত।’

নতুন আলোচক, পুরোনো চ্যালেঞ্জ

এক জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিক জানান, ভ্যান্সকে আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার পক্ষে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ইরানি পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। ইসলামাবাদে তিনি ইরানের প্রতিনিধিত্ব করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে।

হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তাও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গালিবাফকে পছন্দের আলোচক হিসেবে দেখছিলেন। প্রশাসনের আলোচনায় যুক্ত দুই সূত্রের মতে, তেহরানের সাবেক মেয়র হিসেবে তাঁর বাস্তববাদী মনোভাব একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে সহায়ক হতে পারে।

ওই কূটনীতিক বলেন, তেহরানের দৃষ্টিকোণ থেকে ভ্যান্স একজন নির্বাচিত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ায় উইটকফ ও কুশনারের তুলনায় বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করেন। উভয় পক্ষই নিজেদের পছন্দের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনায় বসছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শনিবারের আলোচনা নিয়ে আশাবাদের এটিই হয়তো একমাত্র কারণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঘোষিত অবস্থান এখনো একে অপরের থেকে অনেক দূরে।

উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র বলেছে—ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আর চলতে পারে না। অন্যদিকে ইরান প্রকাশ্যে কখনোই তার পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগের আগ্রহ দেখায়নি।

হোয়াইট হাউসের ভেতরের পরিবেশ সন্দেহপ্রবণ বলে জানিয়েছেন আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। সাম্প্রতিক আলোচনায় ট্রাম্প নাকি স্বীকার করেছেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি দ্রুত পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব নয়। যুদ্ধবিরতি থাকা সত্ত্বেও এটি কার্যত বন্ধই রয়েছে। যদিও বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, দ্রুতই তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হবে—তবে বিস্তারিত কিছু বলেননি।

এই বিশাল মতপার্থক্যই প্রশ্ন তুলছে—ভ্যান্স কি সত্যিই একটি সুযোগ পেয়েছেন, নাকি তাকে একটি ‘বিষের পেয়ালা’ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ভ্যান্সকে আলোচনার কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তুলে ধরতে আগ্রহী। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বুধবারের এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘শুরু থেকেই ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি সব আলোচনায় যুক্ত ছিলেন।’

তবে ভ্যান্স নিজে বিষয়টি নিয়ে তুলনামূলক সংযত। গত বুধবার হাঙ্গেরি সফরের সময় তিনি বলেন, ‘আমার প্রধান ভূমিকা বলতে গেলে, আমি অনেক ফোনে কথা বলেছি। অনেক কল রিসিভ করেছি, অনেক কল করেছি।’ ইরান কি বিশেষভাবে তাঁকে আলোচনায় অংশ নিতে বলেছিল—এমন প্রশ্নে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি জানি না। সত্যি হলে আমি অবাকই হব।’

পুতিনের প্রোপাগান্ডা মেশিন যেভাবে কাজ করে

ইরান যুদ্ধে ‘শান্তির পায়রা’ পাকিস্তান হয়ে উঠল যেভাবে

যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া থেকে বেরোতে চায় মধ্যপ্রাচ্য, আলোচনায় নতুন নিরাপত্তা মডেল

অতীতে যেসব আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সফলভাবে মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান

সুয়েজ ও পানামা খালে টোল বৈধ হলে, হরমুজে কেন নিতে পারবে না ইরান

আলোচনায় কি দূরত্ব ঘুচবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের

যুদ্ধবিরতির পরও হরমুজে অনিশ্চয়তা—উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’

রক্তাক্ত-ক্ষতবিক্ষত হয়েও জয়ী ইরান

ইরানকেও পারমাণবিক শক্তিধর বানাতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানের কাদির খান, যেভাবে চলেছিল কার্যক্রম

নীরবতার চরম মূল্য: ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেভাবে হারিয়ে গেল উপসাগরীয় অঞ্চলে