যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত শনিবার ইরানে যৌথ হামলা চালায়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন। এর পরই দ্রুত পাল্টা জবাবের পথে হাঁটে তেহরান। ইরান জানায়, তাদের প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল এবং অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-সংযুক্ত সামরিক স্থাপনাগুলো। বিশেষ করে উপসাগরীয় যেসব দেশে মার্কিন বাহিনী রয়েছে, সেগুলোও ছিল এই লক্ষ্যতালিকায়।
এই প্রথম দফার পাল্টাপাল্টি হামলার পর এখন আঞ্চলিক রাজধানী ও বৈশ্বিক বাজারের সামনে মূল প্রশ্নটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটি কি কেবল প্রতিশোধের চক্রেই সীমিত থাকবে, নাকি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, মিত্রশক্তি এবং নৌপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে রূপ নেবে?
এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যদের ক্ষতি করার জন্য তেহরানের হাতে থাকা অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ও কৌশলগত উপায়।
কেন এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন
এর আগে, ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে ১২ দিনের যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে চালিয়েছিল, তার সঙ্গে এবারের পরিস্থিতির পার্থক্য রয়েছে। খামেনির হত্যাকাণ্ড তেহরানকে বোঝাতে পেরেছে যে, এটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের লড়াই। তেহরানের বয়ান, প্রতিশোধে বিলম্ব বা সংযম দেখানো দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ হামলার আমন্ত্রণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।
গতকাল রোববার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, খামেনি ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া দেশের ‘দায়িত্ব এবং বৈধ অধিকার।’ কিন্তু সেই ‘প্রতিশোধ’ কীভাবে নিচ্ছে ইরান?
ইরানের লড়াই ও বার্তা দেওয়ার পদ্ধতিতে ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী। এতে রয়েছে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। আধুনিক বিমানবাহিনী না থাকলেও এই সক্ষমতা তেহরানকে দূরপাল্লার আঘাত হানার সুযোগ দেয়।
ইরানি কর্মকর্তারা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে প্রতিরোধের মেরুদণ্ড হিসেবে তুলে ধরেন। কারণ, তাদের বিমানবাহিনী মূলত পুরোনো উড়োজাহাজের ওপর নির্ভরশীল। পশ্চিমা সরকারগুলোর দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার কারণ এবং ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র বহনের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। তেহরান এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে বারবার।
ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। অর্থাৎ, এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন-সংযুক্ত ঘাঁটি এবং বিস্তৃত আঞ্চলিক এলাকাকে আঘাত করতে সক্ষম। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি সত্ত্বেও এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারে না।
১৫০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার পাল্লার স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কাছাকাছি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ও দ্রুত আঞ্চলিক হামলার জন্য তৈরি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ফতেহ সিরিজের বিভিন্ন সংস্করণ, জুলফিকার, কিয়াম-১ এবং পুরোনো শাহাব-১ ও শাহাব-২। সংকটময় পরিস্থিতিতে স্বল্পপাল্লা সুবিধা হয়ে উঠতে পারে। একসঙ্গে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে আগাম সতর্কবার্তার সময় কমিয়ে দেওয়া যায়। এতে আগাম প্রতিরোধ কঠিন হয়।
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরান এই কৌশল ব্যবহার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র দেশটির শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করার পর ইরাকের আইন আল-আসাদ বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় তেহরান। এতে অবকাঠামোর ক্ষতি হয় এবং ১০০ জনের বেশি মার্কিন সেনা ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরিতে আক্রান্ত হন। এতে প্রমাণ হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান শক্তির সমকক্ষ না হয়েও ইরান বড় মূল্য চাপাতে পারে।
স্বল্পপাল্লা যেখানে দ্রুত পাল্টা আঘাতের উপায়, সেখানে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার কিলোমিটার পাল্লার মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিশোধকে আঞ্চলিক সমীকরণে রূপ দেয়। শাহাব-৩, ইমাদ, ঘাদর-১, খোররামশাহর সিরিজ, সেজ্জিল এবং নতুন খাইবার শেখান ও হাজ কাসেম এই সক্ষমতার ভিত্তি।
সিজ্জিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানিচালিত। তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় দ্রুত উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা যায়। শত্রুপক্ষের হামলার আশঙ্কায় দ্রুত প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে এটি সুবিধা দেয়। এই মাঝারিপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলসহ কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত মার্কিন-সংযুক্ত স্থাপনাগুলোকে পাল্লার মধ্যে নিয়ে আসে। ফলে ইরানের লক্ষ্যতালিকা যেমন বিস্তৃত হয়, তেমনি অঞ্চলের ঝুঁকিও বাড়ে।
ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিচু দিয়ে উড়ে এবং ভূখণ্ড অনুসরণ করে এগোতে পারে। এগুলো শনাক্ত ও অনুসরণ করা কঠিন। বিশেষ করে যখন ড্রোন বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে একযোগে ছোড়া হয়, যাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কাছে স্থলভিত্তিক হামলা ও জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুমার, ইয়া-আলি, কুদস সিরিজ, হোভেইজেহ, পাভেহ ও রা’দ। সুমারের পাল্লা ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার।
ড্রোন আরেক স্তরের চাপ তৈরি করে। ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে ধীরগতির হলেও সস্তা এবং একসঙ্গে অনেকগুলো ছোড়া যায়। একমুখী আক্রমণ ড্রোন ঢেউয়ের পর ঢেউ আকারে পাঠিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষা দুর্বল করা যায়। এতে বিমানবন্দর, বন্দর ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সতর্ক অবস্থায় থাকতে বাধ্য হয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, সংঘাত গভীর হলে এই কৌশল আরও বেশি ব্যবহার হতে পারে।
ভূগর্ভস্থ ‘ক্ষেপণাস্ত্র নগর’: প্রথম আঘাতের পর টিকে থাকা
ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে প্রশ্ন হলো, প্রথম দফার হামলা সহ্য করার পর ইরান কতদিন ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারবে। বছরের পর বছর ধরে তেহরান তাদের কর্মসূচির অংশ ভূগর্ভস্থ গুদাম, গোপন ঘাঁটি ও সুরক্ষিত উৎক্ষেপণ স্থাপনায় স্থানান্তর করেছে। দেশজুড়ে বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক দ্রুত ইরানের সক্ষমতা ধ্বংস করা কঠিন করে তোলে। বড় আকারের প্রথম হামলার পরও কিছু সক্ষমতা টিকে থাকবে—এই হিসাব প্রতিপক্ষকে ধরেই নিতে হয়।
সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য এর মানে হলো, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোতে আরও হামলার সিদ্ধান্ত নিলে তা সংক্ষিপ্ত অভিযানের বদলে দীর্ঘস্থায়ী পাল্টাপাল্টি সংঘাতে গড়াতে পারে।
ইরানের প্রতিরোধ কৌশল শুধু স্থলভাগে সীমিত নয়। উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি, যেখান দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস বাণিজ্য হয়, তেহরানকে বৈশ্বিক বাজার কাঁপানোর দ্রুত পথ দেয়। জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-মাইন, ড্রোন ও দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকা ব্যবহার করে ইরান নৌবাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তারা ফাত্তাহ সিরিজের মতো যেসব ‘হাইপারসনিক’ ব্যবস্থা প্রদর্শন করেছে, সেগুলো অত্যন্ত উচ্চগতি ও কৌশলগত চালচলনের দাবি করে। তবে এগুলোর কার্যকর অবস্থান নিয়ে স্বাধীন প্রমাণ সীমিত।
বাজারে প্রভাব ফেলতে আনুষ্ঠানিক অবরোধ প্রয়োজন হয় না। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির নামে পরিচিত রেডিও সতর্কবার্তা, প্রণালির বাইরে ট্যাংকারের অপেক্ষা এবং যুদ্ধঝুঁকি বিমার খরচ বৃদ্ধি ইতোমধ্যে জাহাজ চলাচল ও ভাড়া খরচে প্রভাব ফেলছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালির কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য-সংযুক্ত তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে আঘাত করেছে।
ডেনমার্কভিত্তিক কনটেইনার শিপিং কোম্পানি মায়ের্স্ক রোববার জানায়, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করছে।
ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে নৌ ও আকাশ সক্ষমতা জোরদার করেছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বহু বছরের মধ্যে ইরানের কাছাকাছি এটিই সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক শক্তির সমাবেশ। এতে হামলা ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ে। তবে একই সঙ্গে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকাও দীর্ঘ হয়।
মার্কিন বাহিনী একাধিক দেশে ছড়িয়ে রয়েছে। তারা ঘাঁটি, লজিস্টিক কেন্দ্র ও কমান্ড সেন্টারের নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। সবগুলোকে একই মাত্রায়, সব সময় সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান কয়েকটি স্থানে প্রতিরক্ষা ভেদ করতে পারলে ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক হিসাব বদলে যেতে পারে। আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপ বাড়তে পারে। সংঘাত সীমিত রাখার খরচও বেড়ে যেতে পারে।
ইরানি কর্মকর্তারা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো হামলাকে তারা বৃহত্তর যুদ্ধের সূচনা হিসেবে দেখবেন, সীমিত অভিযান হিসেবে নয়। খামেনির হত্যার পর সেই বার্তা আরও কঠোর হয়েছে।
আইআরজিসি আরও প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে, এটি একক নাটকীয় আঘাত নয়, বরং একটি অভিযান। ইসরায়েলের দিকে ধারাবাহিক উৎক্ষেপণ এবং একাধিক দেশে মার্কিন-সংযুক্ত স্থাপনার কাছে হামলার দাবি ইরানি গণমাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের আশপাশে পদক্ষেপের হুমকিও রয়েছে।
সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে। লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথিরা খামেনির হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে এবং তেহরানের সঙ্গে সংহতির ইঙ্গিত দিয়েছে।
আল জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান